Logo

আন্তর্জাতিক    >>   মানবপাচার: জীবনবাজির এই বিদেশমুখিতা বন্ধ করতে হবে

মানবপাচার: জীবনবাজির এই বিদেশমুখিতা বন্ধ করতে হবে

মানবপাচার: জীবনবাজির এই বিদেশমুখিতা বন্ধ করতে হবে

প্রাইমা হোসাইন:
নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা থামছে না দেশের তরুণদের মধ্যে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র শত শত তরুণকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার পথে—যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে নির্যাতন, বন্দিদশা এবং মৃত্যু।
পরিসংখ্যান বলছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর—এই চার জেলার তরুণদের মধ্যে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর এই বিপজ্জনক যাত্রায় প্রতিবছরই প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকের লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও থামছে না এই মরণযাত্রা।
সাম্প্রতিক ২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে ১৮ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আবারও মানবপাচার চক্রের নির্মমতা সামনে এনেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট, যার শিকড় গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত। নিহতদের অনেকের কাছ থেকেই জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছিল—কিন্তু নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
মানবপাচার চক্র সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে। প্রথমত, স্থানীয় দালালরা গ্রামাঞ্চলের তরুণদের বিদেশে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে। দ্বিতীয়ত, লিবিয়াভিত্তিক এজেন্টরা তাদের বন্দি করে নির্যাতন চালায় এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে করে তাদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে তারা ‘গেম’ নামে আখ্যা দেয়—যেখানে তথাকথিত ‘গেমঘর’ আসলে নির্মম নির্যাতনের অন্ধকার কারাগার।
বাস্তবতা হলো, এই অবৈধ বিদেশযাত্রা খুব কম ক্ষেত্রেই সফলতার গল্প তৈরি করে। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পরিণত হয় একেকটি ট্র্যাজেডিতে—নৌকাডুবি, সীমান্তে মৃত্যু, কিংবা বিদেশে অমানবিক জীবনযাপন। একটি স্বপ্নের জন্য এমন ভয়াবহ মূল্য কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ—দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া এবং সামাজিক বৈষম্য। এসব কারণে হতাশ তরুণরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, দেশের মাটিতে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আর এই হতাশাকেই পুঁজি করছে দালালচক্র।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ। প্রথমত, দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যাতে তারা দেশেই কাজের সুযোগ পায় কিংবা বৈধ উপায়ে বিদেশে যেতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত, বিদেশে কর্মসংস্থানের বৈধ প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও সুলভ করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো—মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে পরিবারগুলো অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্তকে নিরুৎসাহিত করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানো মানে পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। তাই স্বপ্ন দেখতে হবে, কিন্তু সেই স্বপ্নের জন্য জীবন নয়—জীবনের জন্যই স্বপ্ন।
জীবনবাজির এই বিদেশমুখিতা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি নীতিগত অবস্থান নয়, বরং একটি মানবিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের তরুণদের মৃত্যুর পথ থেকে ফিরিয়ে এনে একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের পথে পরিচালিত করতে পারবো।
প্রাইমা হোসাইন, সমাজসেবিকা ও সংগঠক ।