প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিতর্কিত ভূমিকা — জাতি কী বার্তা পেল?
ড. আবদুল আউয়াল:
অনেকেই প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সাম্প্রতিক অবস্থান ও আচরণের পরিবর্তন দেখে হতবাক হচ্ছেন। কিন্তু আমি মোটেও অবাক হইনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্ট চুপ্পুর আসল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে ইতিহাস বিকৃতির ধারায় নিজের নাম যুক্ত করেছেন। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই যে স্বাধীনতার ঘোষক—এটি আদালতের রায়ে স্বীকৃত এবং সংবিধানেও সন্নিবেশিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে এর ব্যত্যয় ঘটানো কতটা গুরুতর অপরাধ—তা আইন প্রণেতারাই ভালো বলতে পারবেন। সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শুনেও মনে হয়েছে, এ জাতিকে হয়তো আরও অনেক চমক দেখতে হবে।
অনেকে বলতে পারেন, প্রেসিডেন্ট তো কেবল লিখিত ভাষণ পাঠ করেছেন। ১৯৯৬–২০০১ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত আরেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদও আওয়ামী লীগ সরকারের লিখিত ভাষণই সংসদে পাঠ করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ভাষণের অনেক বিষয়ের সঙ্গে একমত ছিলেন না, তাই তিনি ভাষণ পাঠের আগে একটি ব্যতিক্রমী ঘোষণা দিয়েছিলেন—এটি তার নিজস্ব বক্তব্য নয়, তিনি কেবল পাঠ করছেন।
অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট চুপ্পু এবং সেনাপ্রধান ওয়াকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে, মানুষ সামান্য স্বার্থ ও লোভের জন্য কত সহজে নীতি বিসর্জন দিতে পারে। বাংলাদেশ যেন সেই বাস্তবতার এক নির্মম উদাহরণ—যেখানে মানুষ এত বড় বেঈমান, স্বার্থপর ও বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে একটি উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠী এখনও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করতে চায় না। তারা স্বাধীনতার স্থপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকে অস্বীকার করে বা বিকৃত করে। সেই দেশে দালাল ও বিশ্বাসঘাতকদের দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর মুনতাসির মামুন আক্ষেপ করে একবার বলেছিলেন,
“বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন।”
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সার্বিক উন্নয়নসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তিনি সবসময় দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্থ রক্ষায় অবিচল থেকেছেন।
বঙ্গবন্ধু হয়তো কিছুটা সৌভাগ্যবান—কারণ অনেক বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতকের কর্মকাণ্ড তিনি নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার; তিনি জীবিত থেকেই এদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছেন। তার জন্য আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো—তার সরকারের মনোনীতদের মধ্যেও কেউ কেউ কেবল সরকারের বিরোধিতা করছেন না, বরং বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সংবিধানকেও অসম্মান করছেন।
এসব দেখে অনেকেই হতাশ হয়ে বলেন—এই দেশ হয়তো আর ঠিক হবে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই বা কী হবে? যুগে যুগে দালাল, চাটুকার ও বেঈমানরা ঘাপটি মেরে বসে থাকে; সুযোগ পেলেই তারা আবার সামনে চলে আসে।
বাস্তবে আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে পরাজিত হয়েছে—এমন উদাহরণ খুবই কম। বরং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং দলের ভেতরের কিছু বেঈমানের কারণেই আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
এই গভীর সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে সাধারণ জনগণ এবং আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
আমি আশাবাদী মানুষ। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আবারও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে—এটি কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে সেই শক্তিকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে দালাল, চাটুকার ও বেঈমানদের চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ড. আবদুল আউয়াল, সাবেক উপাচার্য, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


















