Logo

আন্তর্জাতিক    >>   শেষ বিদায়ে দীর্ঘশ্বাস: ড. ইউনুসের শাসনকাল ও ধ্বংসস্তূপের খতিয়ান

শেষ বিদায়ে দীর্ঘশ্বাস: ড. ইউনুসের শাসনকাল ও ধ্বংসস্তূপের খতিয়ান

শেষ বিদায়ে দীর্ঘশ্বাস: ড. ইউনুসের শাসনকাল ও ধ্বংসস্তূপের খতিয়ান

মানিক লাল ঘোষ:
শোষণ, নির্যাতন ও বিভ্রান্তির এক অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে—এমনটাই মনে করছেন অনেকে। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিদায়ের পর দেশজুড়ে উৎসবের চেয়ে বেশি শোনা গেছে দীর্ঘশ্বাস। যে আশার বেলুন উড়িয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন, সময়ের ব্যবধানে তা ফেটে গিয়ে হতাশা ও অনিশ্চয়তার ভারেই যেন দেশকে আচ্ছন্ন করেছে। বিদায়ের পর পেছনে তাকালে প্রাপ্তির চেয়ে অপূর্ণতা ও ক্ষতের হিসাবই বেশি চোখে পড়ে।
আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রশ্নে তার সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে নাটকীয়তার অভিযোগ যেমন উঠেছে, তেমনি আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার ও দণ্ডপ্রাপ্তদের বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, আইন প্রয়োগে দ্বৈত নীতি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। গুমের অভিযোগের তদন্তে আংশিক তালিকা প্রকাশও বিতর্ককে উসকে দিয়েছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সমালোচনার ঝড় থামেনি। একসময় ‘এশিয়ার রাইজিং টাইগার’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ শিল্প ও কর্মসংস্থানে ধাক্কা খেয়েছে—এমন অভিযোগ বিরোধীদের। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাবাজারের চাপ, বেকারত্ব বৃদ্ধি—এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। সমালোচকরা আরও বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিগত সুবিধা, স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পতন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার অভিযোগও আছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা এবং সামাজিক অস্থিরতার ঘটনাগুলো তার শাসনামলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্ক জাতীয় চেতনার প্রশ্নে নতুন করে বিভাজন তৈরি করেছে বলে সমালোচকদের অভিমত।
পররাষ্ট্রনীতিতেও ছিল টানাপোড়েন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন সমঝোতার গুঞ্জন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ দেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সমালোচকদের হয়রানির অভিযোগ এবং বিরোধী কণ্ঠরোধের সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত হয়ে ওঠে বলে দাবি করা হয়।
ড. ইউনুস বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন এক বিতর্কিত অধ্যায়—ঋণের বোঝা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার স্মারকচিহ্ন। তার সমর্থকরা হয়তো সংস্কারের সাহসী প্রয়াসের কথা বলবেন, কিন্তু সমালোচকদের চোখে এটি ব্যর্থতার খতিয়ান। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোন মূল্যায়ন করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট—এই অধ্যায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত ও সমালোচিত হয়ে থাকবে।
মানিক লাল ঘোষ , সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি