বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘুরা অস্তিত্ব সংকটে — ওয়াশিংটনে মার্কিন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কঠোর সতর্কবার্তা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
ওয়াশিংটন ডিসি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র ও ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় গভীর অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক মানবাধিকার ও সামাজিক কল্যাণমূলক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
সোমবার ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ড. দ্বিজেন ভট্টাচার্য, মানবাধিকার রক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলীপ নাথ, জাতীয় প্রেসক্লাব ঢাকা’র সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, আইনজীবী ও আন্তধর্মীয় অধিকারকর্মী সোরাইয়া এম. দীন, অ্যামনেস্টি ফ্রিডমের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বাংলাদেশের সাবেক প্রসিকিউটর আমর খায়াম ইসলাম, লেখক, প্রকৌশলী ও গবেষক মুসা ইবনে মান্নান, এবং হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ইসলামপন্থী শক্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকার মিলিতভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং একটি অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয় বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ইউএসএ, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ডেমোক্রেসি রিস্টোরেশন ফোরাম, ইউনাইটেড হিন্দুস অব ইউএসএ, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এবং অ্যামনেস্টি ফ্রিডমসহ বিভিন্ন সংগঠন। বক্তারা দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী শক্তি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের অভিযোগ, ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-র মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জামায়াত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বক্তারা আলজেরিয়া (১৯৯১) ও মিসর (২০১২)-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশেও শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মজলিসে শুরা’ কাঠামোর মাধ্যমে দেশকে ধীরে ধীরে আফগানিস্তান বা আইএসআইএল-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের আদলে রূপান্তরের প্রচেষ্টা থাকতে পারে।
ড. দ্বিজেন ভট্টাচার্য তার বক্তব্যে বলেন, “ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি বৈশ্বিক খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। শান্তিপ্রিয় ও সহনশীল আধুনিক মানবসভ্যতা আরেকটি আফগানিস্তান বা আইএসআইএল মডেলকে বহন করতে পারে না। এসব শক্তি চারুকলা, সঙ্গীত, সাহিত্য, লিঙ্গসমতা, নারীর শিক্ষা ও কর্মঅধিকার—সবকিছুর বিরোধিতা করে। সর্বোপরি তারা গণতন্ত্রবিরোধী। আধুনিক মানবসভ্যতার অর্জিত শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধগুলোর বিপরীত অবস্থানে তারা দাঁড়িয়ে আছে। তাই জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রকে বিলম্ব না করে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।”
সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যায় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। সে সময় আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ নিহত, প্রায় দুই লাখ নারী নির্যাতনের শিকার এবং প্রায় এক কোটি মানুষ—যাদের অধিকাংশই হিন্দু—ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। বক্তাদের দাবি, সেই শক্তিগুলোই এখন পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সহিংস অস্থিরতার পর নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তারা অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের আদর্শিক ও সাংগঠনিক সহায়তায় ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো সরকার পতন ঘটিয়ে ৮ আগস্ট ২০২৪ নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করে, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামপন্থীদের নির্বাচনী বিজয় নিশ্চিত করা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এরপর থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অন্তত ২,৯০০টি সহিংস ঘটনার নথিভুক্ত প্রমাণ রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে অগ্নিসংযোগ, গণপিটুনি, ধর্ষণ এবং অন্তত ১৮২টি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দীপু চন্দ্র দাস হত্যার ঘটনাসহ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকে তারা পরিকল্পিত নিপীড়নের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগও তোলা হয়। বক্তারা দাবি করেন, দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, “অপারেশন ডেভিল হান্ট” নামে অভিযানে হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার কারাগারে মৃত্যু ঘটেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তিন লাখ ৫০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী ও সমর্থক আটক হয়েছেন এবং বহু মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।
এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ তুলে বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হত্যা, গণছাঁটাই, মিথ্যা মামলা এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একাধিক পত্রিকা কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আসন্ন নির্বাচনকে “না অবাধ, না অন্তর্ভুক্তিমূলক” আখ্যা দিয়ে বক্তারা বলেন, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা মানে অর্ধেকের বেশি ভোটার—যাদের মধ্যে উদারপন্থী মুসলমান ও প্রায় সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে—তাদের ভোটাধিকার কার্যত খর্ব করা।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে বক্তারা জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের প্রতি অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ না করা হলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং একটি গভীর মানবিক ও গণতান্ত্রিক সংকট অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।


















