নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির বাসভবনের সামনে বোমা হামলার চেষ্টা: সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত দুই তরুণ আটক
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির বাসভবনের বাইরে একটি বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে বোমা হামলার চেষ্টার অভিযোগে দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের দায়ে তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে এই হামলাটি চালিয়েছিল। অভিযুক্তরা হলেন ১৮ বছর বয়সী আমির বালাত এবং ১৯ বছর বয়সী ইব্রাহিম কায়ুমি। তারা পুলিশকে জানিয়েছে, গত শনিবারের এই হামলাটিকে তারা ২০১৩ সালের বোস্টন ম্যারাথন বোমা হামলার চেয়েও 'আরও বড়' রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, বোস্টন ম্যারাথন হামলায় তিনজন নিহত হয়েছিলেন। নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, মেয়র জোহরান মামদানি যেখানে বসবাস করেন, সেই 'গ্রেসি ম্যানশন'-এর বাইরে ওই দুই যুবক দুটি বিস্ফোরক ফাটানোর চেষ্টা করে। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ তাদের গাড়ির ভেতর থেকে তৃতীয় আরেকটি বোমা উদ্ধার করে।
ঘটনাটি একটি ইসলাম-বিরোধী বিক্ষোভ চলাকালীন ঘটেছিল। তবে সৌভাগ্যবশত বিস্ফোরকগুলোর একটিও সঠিকভাবে বিস্ফোরিত হয়নি। ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, একজন অভিযুক্ত বিস্ফোরকটিতে আগুন দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে আটক করা হয়। নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ বলেন, অভিযুক্ত দুজন স্বীকার করেছে যে তারা আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং তারা আইএসের প্রচারণামূলক ভিডিও দেখত। তিনি আরও জানান যে, এর আগে তাদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে আইএসে সরঞ্জাম সহায়তা প্রদান এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা সহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামী পক্ষের কোনো আইনজীবী আছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে টিশ বলেন, 'আমরা ভাগ্যবান যে এই সপ্তাহান্তে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি, যদিও সেগুলো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা রাখত। কিন্তু শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা কোনো কৌশল নয়। এই ধরনের ডিভাইস মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।' টিশ আরও জানান, থানায় নেওয়ার সময় বালাত আইএস সম্পর্কে বেশ কিছু মন্তব্য করেছে, যার মধ্যে একটি ছিল, 'আমি যদি এটি না করতাম, তবে অন্য কেউ এসে এটি করত।' পরবর্তীতে বালাত আশা প্রকাশ করে বলে, এই হামলাটি যেন বোস্টন ম্যারাথন হামলার চেয়েও বড় হয়; কারণ সে লক্ষ্য করেছিল বোস্টন হামলায় মাত্র তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৩ সালের সেই বোস্টন ম্যারাথন হামলায় দৌড়বিদরা যখন ফিনিশ লাইন অতিক্রম করছিলেন, তখন বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হন এবং শত শত মানুষ আহত হন, যার মধ্যে অনেকেরই অঙ্গহানি ঘটেছিল। রবিবার এক বিবৃতিতে মেয়র মামদানি এই ইসলাম-বিরোধী বিক্ষোভকে 'ধর্মান্ধতা ও বর্ণবাদ প্রসূত' বলে অভিহিত করেন এবং পরবর্তী ঘটনাগুলোকে 'আরও বেশি উদ্বেগজনক' বলে বর্ণনা করেন। সোমবার এক পরবর্তী বিবৃতিতে তিনি বলেন, অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে তাদের কাজের জন্য 'সম্পূর্ণ জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত'। তিনি আরও বলেন, 'আমরা নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাব। আমাদের শহরে সন্ত্রাসবাদ বা সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।' পুলিশ কমিশনার টিশ জানান, সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) সতর্ক রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে শহরজুড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিরাপত্তা সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি সেই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানান, যারা নিজেদের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিলেন যখন বিস্ফোরকগুলো জ্বালানো হয়। টিশ জানান, বিস্ফোরকগুলোর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে এতে ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড (টিএটিপি) ব্যবহার করা হয়েছে—যা একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল ঘরে তৈরি বিস্ফোরক। এই রাসায়নিকটি অন্যান্য অনেক সন্ত্রাসী হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি বহু মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারত। পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে আপার ইস্ট সাইডে অভিযুক্তদের একটি গাড়ি খুঁজে পায়। এনওয়াইপিডির একটি রোবট গাড়ির ভেতরে আরও একটি বিস্ফোরক খুঁজে পায় যা প্রথম দুটির মতোই ছিল। সপ্তাহান্তের একটি আপডেটে টিশ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মেয়রের বাসভবনের সামনের এই বিক্ষোভটি জেক ল্যাং নামক একজন উগ্র-ডানপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তি আয়োজন করেছিলেন। তবে তাদের চেয়ে পাল্টা-বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি, যেখানে ১০০-রও বেশি মানুষ অংশ নেন। দুটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালীন সিবিএস নিউজের নিশ্চিত করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বালাত প্রথম 'জ্বলন্ত বিস্ফোরকটি' ছুড়ে মারে, যা একটি ব্যারিয়ারে লেগে নিভে যায়। এরপর সে কায়ুমির কাছ থেকে দ্বিতীয় বিস্ফোরকটি নিয়ে তাতে আগুন দেয় এবং দৌড়াতে শুরু করে, যদিও পরে সেটি ফেলে দেয়। বিস্ফোরকগুলো মূলত কাঁচের বোতলের ভেতরে বিস্ফোরক দ্রব্য ভরে তৈরি করা হয়েছিল এবং এর চারপাশে ধাতব নাট ও বল্টু লাগানো ছিল, যাতে বিস্ফোরণের সময় সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক আঘাত হানতে পারে। এফবিআই তাদের এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছে, এগুলো হাতে তৈরি বিস্ফোরক (আইইডি) ছিল। এফবিআই-এর জয়েন্ট টেরোরিজম টাস্ক ফোর্স (জেটিটিই) এখন সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পাল্টা-বিক্ষোভকারীদের ওপর গোলমরিচের স্প্রে ব্যবহার করার অভিযোগে পুলিশ ২১ বছর বয়সী ইয়ান ম্যাকগিনেস সহ আরও চারজনকে আটক করেছে। সূত্র: রয়টার্স, The Business Standard


















