ছদ্মবেশী বুদ্ধিজীবী, মব-রাজনীতি ও ইতিহাসের প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান এখন জরুরি
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা:
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—অন্যায়, উগ্রবাদ ও ইতিহাস বিকৃতির মুহূর্তে কারা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন, আর কারা নীরব থেকেছেন? গত দেড় বছরে ক্ষমতার অপচর্চা, মব-সহিংসতা এবং সাংস্কৃতিক আক্রমণের সময় যারা তাত্ত্বিক জটিলতা ও নীতির বুলি আওড়ালেও বাস্তব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেননি, আজ তাদের নতুন করে ‘বুদ্ধিজীবী’ সাজার প্রচেষ্টা জনগণের চোখ এড়ায়নি।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই পরাজিত শক্তির আত্মসমালোচনার বদলে কেউ কেউ নারী বিদ্বেষ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, বাউলদের উপর আক্রমণ, মাজার ভাঙা এবং সাংস্কৃতিক চর্চা বাধাগ্রস্ত করার রাজনীতিকে ‘বিশুদ্ধকরণ’-এর ভাষায় ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু মানুষ সরল নয়—তারা দেখেছে, বুঝেছে এবং মনে রেখেছে। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক Bangabandhu Memorial Museum—যা ‘৩২ নম্বর’ নামে অধিক পরিচিত—শুধু Sheikh Mujibur Rahman-এর বাসভবন নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক প্রতীকী স্তম্ভ। এর উপর আঘাত কোনো দলবিরোধী অবস্থান নয়, বরং জাতির রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির উপর আঘাত। এটিকে কোনো একক দলের সম্পত্তি ভাবা যেমন ভুল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে একক রাজনৈতিক কৃতিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাও ইতিহাসের প্রতি অবিচার। মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের মানুষের সম্মিলিত অর্জন।
মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, জাদুঘর বা প্রতীক ধ্বংস করা কোনো ধর্মীয় চেতনার প্রকাশ নয়; বরং একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিশোধপরায়ণতা ও পেশিশক্তির প্রদর্শন। ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে যারা এই অপকৌশল চালায়, তাদের চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন অপব্যবহার রোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
গত দেড় বছরের মব-সহিংসতা কখনোই সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না; এর পেছনে সংগঠিত প্ররোচনা ছিল। অপরাধী যে দলেরই হোক, আক্রমণ ও অপমানের রাজনীতি কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। অথচ এই ভাষায় কথা বলতে অনেকের এত সংকোচ কেন ছিল—সে প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। নীরবতা প্রায়ই সুবিধাবাদের আরেক নাম।
বাউলদের আধ্যাত্মিক চর্চায় আঘাত, মাজার ধ্বংস, পালা গান বন্ধ করা, কনসার্ট ও নাটক বাধাগ্রস্ত করা—এসব কেবল সংস্কৃতির উপর হামলা নয়; এটি এ দেশের সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে আঘাত। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সমাজকে বিভক্তই করে।
মুক্তিযোদ্ধা হওয়া মানেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। যারা ক্ষমতার লোভে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিক্রি করেছেন, তাদের সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি যে কোনো নতুন ‘চেতনা’কে পুঁজি করে রাজনৈতিক বাণিজ্য করাও সমানভাবে নিন্দনীয়। শিক্ষার্থীদের দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানকে উদযাপন করা কিংবা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয়কে দক্ষতা হিসেবে তুলে ধরা তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার শামিল। নৈতিকতা কখনো পরিস্থিতিভিত্তিক হতে পারে না।
নারীর অভিভাবক সাজার নামে পিতৃতান্ত্রিক বয়ান, নারী বিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণা—এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে যারা ছলে-বলে-কৌশলে সেই বয়ানকে বৈধতা দেন, তাদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়বেই।
এই নির্বাচনের রায় কোনো একক দলের পকেটে যায়নি; এটি ছিল উগ্রবাদ, নারী বিদ্বেষ, ইতিহাস বিকৃতি ও সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থান। ভিন্ন রাজনৈতিক মতের বহু মানুষও দেশকে অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করতে ভোট দিয়েছেন। এই স্বতঃস্ফূর্ত জনরায়ের প্রতি সম্মান দেখানো এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।
জনাব Tarique Rahman—মানুষ একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই আস্থার মর্যাদা দিন। এ দেশের মানুষ যেন আবার হতাশ না হয়—এই প্রত্যাশাই রইল।
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা, শিক্ষিকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


















