সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: সংসদীয় গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধ্রুবতারা
মানিক লাল ঘোষ:
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৫ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর আইনশাস্ত্রে শিক্ষালাভ করে নিজেকে একজন দক্ষ আইনবিদ হিসেবে গড়ে তোলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৫ বছর বয়সে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ—এক সত্যিকারের ধ্রুবতারা।
ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনীতির হাতেখড়ি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনসহ আইয়ুববিরোধী প্রতিটি গণআন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারির একজন সংগঠক ও বক্তা। হাওর অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলাই তাকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে। ছাত্রজীবনে তিনি কেবল তাত্ত্বিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি; সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে। সত্তরের দশকের উত্তাল সময়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) তরুণ নেতা হিসেবে তার বাগ্মিতা, মেধা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আদর্শগত ভিন্নতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু তাকে গভীর স্নেহে গ্রহণ করেন এবং তার রাজনৈতিক সক্ষমতার মূল্যায়ন করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাপ থেকে বিজয়ী হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান দরকার।” এই কথাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে সংসদীয় রাজনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক দর্শন তাকে একজন প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী রাজনীতিকে পরিণত করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন একজন সক্রিয় সম্মুখযোদ্ধা। ৫ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল নির্ধারণেও অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। তার দেশপ্রেম ছিল আজন্ম লালিত এক চেতনা, যা তাকে আজীবন সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে অনেকে ‘লিভিং কনস্টিটিউশন’ বা জীবন্ত সংবিধান বলে অভিহিত করতেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন তিনি। সংসদে কোনো আইনি জটিলতা বা সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়ত তার দিকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এক অনন্য রেকর্ড গড়েন। ১৯৭০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তার সংসদীয় যাত্রা আধুনিক বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দর্শন তিনি ধারণ করেছিলেন হৃদয়ের গভীরে। তার বিশ্বাস ছিল—এই দেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সকলের। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোর প্রবল বিরোধী এই নেতা দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করতেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” উগ্রবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠস্বর ছিল সবসময় স্পষ্ট ও আপসহীন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তব্যে প্রায়ই রসবোধের আড়ালে থাকত গভীর রাজনৈতিক দর্শন। তিনি বলতেন, “সংসদ হচ্ছে তর্কের জায়গা, যুক্তির জায়গা—এখানে গায়ের জোর নয়, যুক্তির জোর দেখাতে হয়।” জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়নসহ সংখ্যালঘুদের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তার অবদান জাতি চিরকাল স্মরণে রাখবে। আজ তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। দেশ ও জাতির সংকটে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকের অভাব বারবার অনুভূত হবে।
মানিক লাল ঘোষ। সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ।


















