Logo

আন্তর্জাতিক    >>   হাসিনা যুগের অবসান?—আল জাজিরাকে সজীব ওয়াজেদ জয়: “সম্ভবত তাই”

হাসিনা যুগের অবসান?—আল জাজিরাকে সজীব ওয়াজেদ জয়: “সম্ভবত তাই”

হাসিনা যুগের অবসান?—আল জাজিরাকে সজীব ওয়াজেদ জয়: “সম্ভবত তাই”

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অধ্যায়ের কি অবসান ঘটতে যাচ্ছে—এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছেন তার ছেলে ও আওয়ামী লীগের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, শেখ হাসিনাকে হয়তো আর দলের নেতৃত্বে দেখা যাবে না।
ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজের বাসভবনে আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জয় বলেন, তার মা দেশে ফিরতে চান, তবে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার বিষয়ে তিনি আগ্রহী। তার ভাষায়, শেখ হাসিনার বয়স এখন ৭৮ বছর এবং এমনিতেই এটি তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শেখ হাসিনা আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকতে চান না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলে দলটি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। দলটির অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং দেশে থাকা বহু নেতাকর্মী কারাবন্দি অবস্থায় আছেন।
সাক্ষাৎকারে আল জাজিরার সাংবাদিক সরাসরি জানতে চান—এ পরিস্থিতিকে কি ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ বলা যায়? উত্তরে জয় বলেন, “সম্ভবত তাই।” একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল নয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল, যার প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাস রয়েছে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বা তাকে ছাড়াও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকবে বলে দাবি করেন তিনি।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে জয় বলেন, আওয়ামী লীগের এখনও শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, দলের প্রতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে, যা দেশের প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। তার মতে, এই বিশাল জনগোষ্ঠী হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে আল জাজিরার সাংবাদিক ‘নিয়তির পরিহাস’ উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন—এক সময় জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিল, আর এখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়েও অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগের বিষয়টি সামনে আনা হয়। জবাবে জয় বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেনি। তার ভাষায়, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল আদালতের রায়ের মাধ্যমে।
২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে জয় দাবি করেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত জরিপে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পূর্বাভাস ছিল। তিনি বলেন, প্রশাসনের ভেতরে কিছু ব্যক্তি অতিরিক্ত উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা দলের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তিনি আরও জানান, এসব ঘটনায় শেখ হাসিনা ও তিনি দু’জনই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে জয় বলেন, সেখানে কোনো কারচুপি হয়নি। বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জনকে তিনি ‘দুর্ভাগ্যজনক’ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তিনি কখনো সহিংসতার হুমকি দেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যখন একটি দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হয়, প্রতিবাদের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়—এটি বাস্তবতার বর্ণনা, হুমকি নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে জয় দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের পর থেকে শত শত নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং ত্রিশের বেশি মানুষ হেফাজতে মারা গেছেন। সম্প্রতি এক সংখ্যালঘু আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে নিহত হওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন জয়। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের যদি সহিংস কর্মকাণ্ড চালানোর সক্ষমতা থাকত, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার টিকে থাকা সম্ভব হতো না। তার দাবি, হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই।
আল জাজিরাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় একদিকে শেখ হাসিনার অবসর ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার প্রত্যাশা ও দাবি তুলে ধরেছেন। এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন, দলীয় ভবিষ্যৎ এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। সূত্র: সন্ধান।