Logo

আন্তর্জাতিক    >>   জেলা প্রশাসনে সেনা সমন্বয় নিয়ে জনমনে প্রশ্ন–সংবিধান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

জেলা প্রশাসনে সেনা সমন্বয় নিয়ে জনমনে প্রশ্ন–সংবিধান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

জেলা প্রশাসনে সেনা সমন্বয় নিয়ে জনমনে প্রশ্ন–সংবিধান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

নয়ন বিশ্বাস রকি:
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনীর মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা, সমালোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। রাজপথ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আড্ডায়ও এখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—রাষ্ট্র কি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারার মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে, নাকি দেশ ধীরে ধীরে ভিন্ন এক শাসন কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন, বর্তমান পরিস্থিতি কি পাকিস্তানি ধাঁচের শাসনব্যবস্থার প্রতিফলন? নাকি এটি সেনা-সমর্থিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত বহন করছে? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলেও সেনাবাহিনীর একটি সমর্থনমূলক ভূমিকা ছিল। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জনগণের প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি আবার সেই বাস্তবতার দিকেই ফিরে যাচ্ছে?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬১ অনুযায়ী দেশের প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহের সর্বাধিনায়কতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এবং তা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। বাহিনীগুলোর প্রধান দায়িত্ব দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা। একই সঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।” অর্থাৎ জনগণের ম্যান্ডেটই রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র বৈধ ভিত্তি।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৯ থেকে ১৩২ ধারা এবং সেনা আইন, ১৯৫২ অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিধান রয়েছে। তবে এসব আইনের উদ্দেশ্য “Aid to Civil Power”—অর্থাৎ বেসামরিক প্রশাসনকে সাময়িক ও জরুরি সহায়তা প্রদান। কোথাও স্থায়ীভাবে প্রশাসনের বিকল্প বা সমান্তরাল শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা বলা হয়নি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতির গর্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাদের প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড মূলত যুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তা কেন্দ্রিক। দীর্ঘদিন মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকলে বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ও যুদ্ধ প্রস্তুতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যে আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে, তা তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষ অবস্থানের ফল। তাই সেনাবাহিনীকে তাদের মূল সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে দীর্ঘ সময় অন্য খাতে ব্যস্ত রাখার বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনগণের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানের পর মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন আরও বেড়েছে। একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও কেন এখনো সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে—সে বিষয়েও জনগণ স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮৩ অনুযায়ী, সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর আরোপ করা যায় না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অর্থ ও ব্যয়ের প্রকৃত মালিক জনগণই। সেই জনগণের একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন—দেশ পরিচালনার বর্তমান ধারা কি সত্যিই জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে?
দেশের সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, সরকার অবিলম্বে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেবে। কোন আইনি কাঠামোর অধীনে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সমন্বয় চলছে, কত দিনের জন্য এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে এবং এর উদ্দেশ্য কী—তা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে।
একই সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর ও স্বাভাবিক করে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা জরুরি। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬১ অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের ধারাবাহিকতাই যে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ—তা আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের গর্ব, আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক। তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও জনগণ সবার দায়িত্ব। জাতি আশা করে, রাষ্ট্র সংবিধান ও আইনের পথেই এগিয়ে যাবে এবং জনমনের সব সংশয় দূর করবে। কারণ গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের কোনো বিকল্প নেই।
নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক।