অধিকার: বাণিজ্য চুক্তির চাপে বিপর্যয়ের মুখে কৃষি
- By Progga News Desk --
- 06 May, 2026
লাকী আক্তার:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে কার্যতগোপনে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিস্বাক্ষর করে। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বা ইংরেজিতে ‘ইউএস-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেডএগ্রিমেন্ট’ নামে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তির প্রতিটি ছত্রেবাংলাদেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
যেমন, এই চুক্তির কৃষি-সম্পর্কিত শর্তগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত, যা বাংলাদেশের কৃষকদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেবে। চুক্তিরশেষ অংশে বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছরে কী কী কৃষিপণ্যকিনতে হবে, তা বলা হয়েছে, আর্থিক মূল্যে যা গড়ে বছরে সাড়েতিন বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ধারা ৫, উপধারা ৬, ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, প্রতিবছরবাংলাদেশকে কমপক্ষে সাত লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে গম, এক বছরে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার বা ২.৬ মিলিয়ন টন সয়াবিনও সয়াজাত পণ্য এবং প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা ওঅন্যান্য পণ্য কিনতে হবে। এখানে বাংলাদেশের সামর্থ্য কিংবাইচ্ছা থাকা না-থাকা বিবেচ্য নয়। এমনকি আন্তর্জাতিকবাজারের চেয়ে বেশি দামে হলেও এসব পণ্য বাংলাদেশকেযুক্তরাষ্ট্র থেকেই কিনতে হবে।
তাদের লক্ষ্য হলো গম, সয়াবিন, তুলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্নকৃষিপণ্য যেন অবাধে বাংলাদেশের বাজার দখল করতে পারে।এ জন্য আমেরিকার গম, সয়াবিন, তুলা, ডেইরি, মাংসসহ প্রায়সব কৃষিপণ্য ধাপে ধাপে বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত হবে।কিছু পণ্য চুক্তি কার্যকরের দিন থেকেই (ইআইএফ ক্যাটেগরি)শুল্কমুক্ত, আর কিছু পণ্যের শুল্ক ৫ বা ১০ বছরের মধ্যে (বি৫, বি১০) সম্পূর্ণ উঠে যাবে। সাড়ে চার হাজারের বেশি পণ্যেশুল্কছাড় আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার অস্থিতিশীল করেরাজস্বের ওপর ব্যাপক চাপ বাড়াবে। খাদ্যে সার্বভৌমত্বেরভিত্তিও তাতে নস্যাৎ হবে।
অ্যানেক্স ৩-এর অনুচ্ছেদ ১.৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রেরখাদ্য ও কৃষি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এসপিএস ও টেকনিক্যালরেগুলেশনকে নিজেদের ব্যবস্থার সমতুল্য হিসেবে স্বীকার করতেবাধ্য। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো রপ্তানি সনদপত্র বাইলেকট্রনিক ডেটা এলিমেন্টে পরিবর্তনের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রেরসম্মতি নিতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাসংস্থাগুলোর (যেমন বিএসটিআই) নিজস্ব মান নির্ধারণ ওনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে।
চুক্তির অনুচ্ছেদ ১.৬-এ বলা আছে, চুক্তি কার্যকরের ২৪ মাসেরমধ্যে বাংলাদেশকে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতেযুক্তরাষ্ট্রে বৈধ কোনো জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) ফসল বা পণ্য বাংলাদেশে পুনরায় পরীক্ষা, অতিরিক্ত লেবেলবা অনুমোদন ছাড়াই আমদানি ও বাজারজাত হতে পারে।মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব পণ্য।
অনুচ্ছেদ ১.৭ বলা আছে, প্রক্রিয়াজাত করলে সেই পণ্যকে‘নন-লিভিং’ বলে চিহ্নিত করে জৈব নিরাপত্তা আইনের আওতাথেকে বের করে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জৈবনিরাপত্তা বিধিমালা (বায়োসেফটি প্রটোকল) অকার্যকর হবে।দেশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জিএম সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা প্রবেশকরবে। দেশীয় বীজের ভান্ডার বিনষ্ট হবে। কৃষক জিএমওবীজের ওপর নির্ভরশীল হবে, বীজের বৈচিত্র্য কমে যাবে। এতেবিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর কাছে দেশ জিম্মি হয়ে পড়বে।
অনুচ্ছেদ ১.৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ডেইরি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সমতুল্য স্বীকৃতি দেবে এবং ইউএসডিএর স্যানিটারিসনদপত্রেই ডেইরি পণ্য আমদানি করতে পারবে। কোনো স্থানীয়ফ্যাসিলিটি নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই। মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রেওইউএসডিএর এফএসআইএস সনদপত্রই যথেষ্ট হবে।
চুক্তির বলে গ্রোথ হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত আমেরিকানগরুর মাংস বা দুগ্ধজাত পণ্য সহজেই দেশের বাজার দখলকরবে। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মাংস আমদানি করলেএকদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকবে, অন্যদিকে দাম কমে গেলেবাংলাদেশের মাংসের বাজারেও ধস নামবে। বিপুল মানুষকর্মসংস্থান হারাবে এবং গ্রামীণ কৃষির বিপর্যয় ঘটবে। এর মধ্যদিয়ে দেশীয় গবাদি পশুর সংকট দেখা দেবে কৃষক ওপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে।
অনুচ্ছেদ ১.৮ (এইচপিএআই) অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকরের ১৮০দিনের মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড ফ্লু আক্রান্ত এলাকারস্বীকৃতি রাজ্য পর্যায় থেকে ১০ কিলোমিটার জোনে নামিয়েআনবে। অর্থাৎ ১০ কিলোমিটার এলাকার বাইরে সমগ্রযুক্তরাষ্ট্রকে ‘বার্ড ফ্লুমুক্ত’ ধরে নিতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রেরপোলট্রি রপ্তানি উপযুক্ততা নির্ধারণ করবেইউএসডিএ-এপিএইচআইএস; বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষনয়। দেশীয় পোলট্রি খামারিরা এই ধারার কারণে ক্ষতিগ্রস্তহবেন। তা ছাড়া বাংলাদেশেরই এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ন্ত্রণেরসক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগের সুযোগ থাকবে না।
অনুচ্ছেদ ১.১০ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যেখানে নিজস্বকীটনাশকের অবশিষ্টাংশের সর্বোচ্চ মাত্রা (এমআরএল) নির্ধারণ করেনি, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহনশীলতা (টলারেন্স) বা কোডেক্স এমআরএল স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে।কোনো পণ্য এমআরএল লঙ্ঘন করলেও শুধু সেই নির্দিষ্টপ্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, সব মার্কিন পণ্যেরওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যাবে না। এর মধ্য দিয়ে বিএসটিআইরভূমিকা খর্ব হবে। বিএসটিআই একটা নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানেপরিণত হবে।
অনুচ্ছেদ ১.১১ (প্লান্ট অ্যান্ড প্লান্ট প্রডাক্টস মার্কেট অ্যাকসেস) অনুযায়ী, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নতুন উদ্ভিদপণ্যেরবাজার প্রবেশের আবেদন জমা দেওয়ার ২৪ মাসের মধ্যেপ্রটোকল চূড়ান্ত করতে হবে। এ ছাড়া পেস্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য‘সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ (আইএসএম ১৪) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্বকৃষি-জীববৈচিত্র্য ও বীজ আইন অনুযায়ী কোনো পণ্যআমদানিতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও এ চুক্তিরবেড়াজালে তা প্রায় অচল হয়ে যাবে। কৃষকদের দেশীয় বীজএখানে সংকটে পড়ার শঙ্কা আছে। সূত্র: সমকাল
লাকী আক্তার, কৃষক নেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।



















