হাওরের ধান ডুবছে, রাষ্ট্র কি জাগবে? — খাদ্য নিরাপত্তা ও সুনামগঞ্জের কৃষকের বাঁচা-মরার লড়াই
সুব্রত তালুকদার:
সুনামগঞ্জ তথা ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা একমাত্র নির্ভর করে বোরো ধানের উপর। এই একটি ফসলই তাদের বছরের পুরো আয়ের প্রধান উৎস। সেই বোরো ধান যদি ঘরে তোলা না যায়, তাহলে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য নেমে আসে চরম দুর্দশা—ক্ষুধা, ঋণ, এবং অনিশ্চয়তার এক নির্মম বাস্তবতা।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও বৈশাখের শুরুতেই অতি বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চল থেকে নেমে আসা ঢল খুব অল্প সময়ে হাওর প্লাবিত করে ফেলে। নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই ফসলি জমি পানির নিচে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট বোরো ধানের একটি বড় অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে, যার মধ্যে সুনামগঞ্জ অন্যতম প্রধান। প্রতিবছর এই অঞ্চল থেকে প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট চাল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। কৃষি অর্থনীতির হিসাব অনুযায়ী, হাওরের একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট হলে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয় এবং লক্ষাধিক কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাস্তবতা আরও কঠিন—হাওর অঞ্চলের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অনেক কৃষক ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ কিংবা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে চাষাবাদ করেন। ফসল নষ্ট হলে তারা ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে জমি বিক্রি করা বা পেশা পরিবর্তন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো হাওরের বাঁধ ব্যবস্থাপনা। প্রতিবছরই দেখা যায়, অপরিকল্পিত নির্মাণ, নিম্নমানের কাজ এবং দুর্নীতির কারণে বাঁধ টেকসই হয় না। অনেক বাঁধ সময়মতো মেরামত করা হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই বর্ষা চলে আসে। ফলে সামান্য চাপেই বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখন হাওর অঞ্চলে স্পষ্ট। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেছে, অনিয়মিত ও অতিরিক্ত বৃষ্টি বাড়ছে, যা আগাম বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে আগের চেয়ে এখন ফসল ঝুঁকির মুখে আরও বেশি।
এই সংকট মোকাবিলায় কিছু জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন -
নদী, খাল ও বিল পুনঃখননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা , টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক বাঁধ নির্মাণ এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা , দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা , আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা ,ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল ও প্রণোদনা প্রদান ,হাওর অঞ্চলের জন্য বিশেষ কৃষি বীমা চালু করা
আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে, সিলেটস্থ সুনামগঞ্জ ছাত্র কল্যাণ পরিষদের ব্যানারে আমরা হাওরের ফসল রক্ষার দাবিতে ‘উরা-কোদাল’ নিয়ে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ অভিমুখে পদযাত্রা করেছিলাম। সেই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল—পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি বন্ধ করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু দুই দশক পরেও বাস্তবতা খুব বেশি বদলায়নি।
আমি একজন কৃষকের সন্তান। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে আমার জন্ম—এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই যখন দেখি হাওরের ধান পানিতে তলিয়ে যায়, তখন সেটা কেবল একটি সংবাদ নয়—এটি আমার অস্তিত্বের গভীরে আঘাত করে।
আজ প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি এই আর্তনাদ শুনবে? নাকি প্রতিবছরের মতো আবারও প্রতিশ্রুতির আড়ালে বাস্তবতা চাপা পড়ে থাকবে?
হাওরের ফসল রক্ষা মানে শুধু একটি অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এখনই সময় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। আসুন, আমরা সবাই মিলে সুনামগঞ্জের কৃষকদের পাশে দাঁড়াই। কারণ কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—হাওর বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
কলামিস্ট সুব্রত তালুকদার , নিউইয়র্ক ।



















