Logo

আন্তর্জাতিক    >>   ২৬ মার্চ: পরাধীনতার ছোবল থেকে জনগণের মুক্তি অনিবার্য

২৬ মার্চ: পরাধীনতার ছোবল থেকে জনগণের মুক্তি অনিবার্য

২৬ মার্চ: পরাধীনতার ছোবল থেকে জনগণের মুক্তি অনিবার্য

প্রাইমা হোসাইন:
আজ ২৬ মার্চ—বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে গৌরব, আত্মত্যাগ ও মুক্তির এক অমলিন প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার অমোঘ অভিযাত্রা শুরু করে।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ—আমাদের আত্মপরিচয়ের এক গর্বিত নাম।
এই মহান দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্বে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন স্বাধীনতার লক্ষ্যে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের আত্মত্যাগে রচিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস। একইসঙ্গে স্মরণ করি ২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় কালরাতের নিরস্ত্র মানুষদের, যাদের ওপর নেমে এসেছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞ, এবং যাদের রক্তেই রচিত হয়েছিল প্রতিরোধের সূচনা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১—এই ২৩ বছরের শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস বাঙালির চেতনাকে জাগ্রত করে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা এবং ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ধাপেই বাঙালি তার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রসর হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ হয়ে ওঠে সেই চূড়ান্ত লড়াই, যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যখন ঘোষণা করেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—তখনই জাতি পেয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতারের পূর্বে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে এনে দেয় চূড়ান্ত প্রেরণা। এরপর আপামর জনতা “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বিজয়।
তবে স্বাধীনতার এই গৌরবগাথা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি তা বেদনাবিধুরও। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস থেকে বিচ্যুত ছিলাম। ফলে একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে বিভ্রান্ত ইতিহাসের মধ্যে, যা আমাদের জাতীয় চেতনায় এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। তাই আজও আমাদের বারবার সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে হয়—নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও সামাজিক খাতে অভাবনীয় অগ্রগতি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। বিদ্যুৎ, সড়ক, সেতু, মেট্রোরেল, টানেল—সবকিছুই আজ উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। এসব অগ্রগতির পেছনে রয়েছে দূরদর্শী নেতৃত্ব ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রপরিচালনা।
তবুও আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা, নৈরাজ্য ও রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। যখন কোনো ন্যায্য আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় এবং জাতীয় স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশকে পিছিয়ে দেয়, সৃষ্টি করে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা।
আজকের এই মহান দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। কোনো ধরনের পরাধীনতা, অন্যায়, দুর্নীতি বা প্রতিহিংসার রাজনীতির কাছে মাথানত করব না।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—
পরাধীনতার ছোবল থেকে জনগণের মুক্তি অনিবার্য।
প্রাইমা হোসাইন, সমাজসেবিকা ও সংগঠক