অবৈধ শাসনের ছায়ায় বাংলাদেশ: সংকট, সমালোচনা ও জনগণের প্রত্যাশা
প্রাইমা হোসাইন:
বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস এর নেতৃত্বাধীন বর্তমান শাসনামল ঘিরে দেশজুড়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতি থেকে শুরু করে মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগ থেকে গণমাধ্যম—রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার অভিযোগ উঠছে। একজন সচেতন নাগরিক ও সমাজকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, এই বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি।
বর্তমান শাসনামলে দেশের অর্থনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জনমনে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন। কিন্তু বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও চাপ, এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশের কারণে হয়রানি ও সেন্সরশিপের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে নানা মহল থেকে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, বিচারকদের ওপর চাপ এবং রাজনৈতিক মামলায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আইনের শাসনের প্রতি আস্থা নষ্ট করছে। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার কাঠামো দুর্বল হলে গণতন্ত্রের ভিত কেঁপে ওঠে—এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
বর্তমান শাসনামলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। ক্ষমতার বলয়ে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রাধান্য, প্রশাসনে পক্ষপাতমূলক নিয়োগ এবং কিছু প্রভাবশালী পরিবারের ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
জনমতের একটি বড় অংশ মনে করে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর নেতৃত্বে দেশ উন্নয়ন, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা তখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল বলে অনেকের অভিমত।
বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কার্যক্রম অবৈধভাবে স্থগিত করার অভিযোগ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়েছে বলে দাবি উঠেছে। জনগণের একটি অংশ এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহার এবং রাজবন্দীদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে, যাতে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হতে পারে।
দেশের মানুষ মূলত শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। তারা এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রত্যাশা করে যেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা পাবে এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সংলাপ ও জাতীয় ঐক্যের উপর। বর্তমান সংকট উত্তরণে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সৎ উদ্যোগ।
প্রাইমা হোসাইন, বিশিষ্ট সমাজসেবিকা ও সংগঠক


















