Logo

আন্তর্জাতিক    >>   বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ‘ওয়াক ফর পিস’ এবং সারমেয় ‘আলোকা’: যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে অহিংসা ও মৈত্রীর বার্তা

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ‘ওয়াক ফর পিস’ এবং সারমেয় ‘আলোকা’: যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে অহিংসা ও মৈত্রীর বার্তা

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ‘ওয়াক ফর পিস’ এবং সারমেয় ‘আলোকা’: যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে অহিংসা ও মৈত্রীর বার্তা

সুরীত বড়ুয়া:
হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ আর যুদ্ধের বিভীষিকায় যখন বিশ্ব আজ দিশেহারা, ঠিক তখনই একদল শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হাতে শান্তির পতাকা নিয়ে পথে নেমেছেন—‘ওয়াক ফর পিস’-এর আহ্বানে। ভারতের কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু হওয়া এই শান্তির পদযাত্রা আজ পৌঁছে গেছে আমেরিকার মাটিতে। তাদের লক্ষ্য—অহিংসা, মৈত্রী ও মানবতার বাণী ছড়িয়ে দেওয়া।
কলকাতায় ১৯ জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর পদযাত্রা শুরু হলে কৌতূহলী জনতার নজরে আসে একটি সাধারণ পথকুকুর। ধীরে ধীরে সে সন্ন্যাসীদের সঙ্গেই হাঁটতে শুরু করে। ভিক্ষুরা যেখানে বিশ্রাম নেন, সেও সেখানে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। ভোরে তারা যাত্রা শুরু করলে সেও পা মেলায় তাদের সঙ্গে। সন্ন্যাসীদের স্নেহে তার নাম রাখা হয়—‘আলোকা’।


শীর্ণ চার পা, কিন্তু অদম্য মনোবল। একদিন গাড়ির ধাক্কায় আহত হলেও ট্রাকে তোলার চেষ্টা ব্যর্থ করে সে আবার নেমে আসে পদযাত্রায়। যেন এই পথচলাতেই তার আনন্দ, তার জীবন। রাস্তার নানা প্রলোভন, কোলাহল, বিভ্রান্তি—কিছুই তাকে টলাতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আলোকা’ আজ বিস্ময়ের নাম। মানুষ বলছে—যে শান্ত, শিষ্টতা ও নম্রতার পরিচয় আমরা দিতে পারিনি, এক সাধারণ পথকুকুর যেন তা দেখিয়ে দিল।
পরবর্তীতে সন্ন্যাসীদের লক্ষ্য স্থির হয় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু আলোকাকে সঙ্গে নেওয়া সহজ ছিল না। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি অনুমতি—সবকিছু সম্পন্ন করতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে হয়েছে। অবশেষে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সন্ন্যাসীরা আলোকাকে নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি জমান।
২৬ অক্টোবর থেকে টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে শুরু হওয়া প্রায় ২৩০০ মাইলের এই পদযাত্রা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি অঙ্গরাজ্য অতিক্রম করেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া—তুষার, ঝড়, বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ সন্ন্যাসীদের স্বাগত জানিয়েছে; অনেক স্থানে সম্মানসূচকভাবে তাঁদের উত্তরীয়ে পুলিশ ব্যাজ পরিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
রাস্তার দুইধারে শান্তিকামী মানুষ ফুল, খাদ্য ও পানীয় দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। বিনিময়ে সন্ন্যাসীরা বুদ্ধের মৈত্রীর বাণী উচ্চারণ করে দুঃখ, জরা, ব্যাধি ও অশান্তি থেকে মুক্তির আশীর্বাদ করেছেন।


বিশ্ব যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গাজা-প্যালেস্টাইন সংকট এবং নানা প্রান্তের সহিংসতায় বিপর্যস্ত—তখন এই পদযাত্রা যেন এক নীরব প্রতিবাদ। ক্ষমতালোভী রাজনীতির বিভাজন, ধর্মের নামে অধর্ম, মানবতার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চারণ করছেন—“যুদ্ধ নয়, শান্তি।”
আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে তথাগত সম্যকসম্বুদ্ধ তাঁর ভিক্ষু সংঘকে উপদেশ দিয়েছিলেন—“বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায় দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ো, আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তিমে কল্যাণ নিহিত যে ধর্ম, সেই মৈত্রীর ধর্ম প্রচার করো।” সেই বাণীকেই ধারণ করে সন্ন্যাসীরা এগিয়ে চলেছেন অহিংসার অভিযাত্রায়।
‘ওয়াক ফর পিস’ কেবল একটি পদযাত্রা নয়—এটি মানবতার জাগরণের আহ্বান। একটি সাধারণ পথকুকুর ‘আলোকা’ সন্ন্যাসীদের মমতার স্পর্শে যেমন নতুন জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে, তেমনি মানুষও কি পারে না নিজেদের অন্তরের অন্ধকার সরিয়ে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে?
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক—এই প্রার্থনাই আজ ‘ওয়াক ফর পিস’-এর মূল সুর।
সুরীত বড়ুয়া ,লেখক, কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক নিউইয়র্ক ।