জাতির উদ্দেশে আবেগঘন ভাষণ: অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ, ‘রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে’ ফেরানোর অঙ্গীকার তারেক রহমানের
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তারেক রহমান। সোমবার রাতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর চেয়ারম্যান বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়; এটি রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্বাচন।
ভাষণের শুরুতেই তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে প্রাণ হারানো শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, এই সময়ে গণতন্ত্রকামী মানুষ গুম, খুন ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে বহু প্রাণহানির কথাও উল্লেখ করেন তিনি এবং বলেন, “এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।”
সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল অতীতের ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল–ত্রুটি’ নিয়ে তার বক্তব্য। তিনি বলেন, অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়েছে; সেজন্য তিনি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই ভবিষ্যতের পথচলা নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান একটি স্বনির্ভর, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দলের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের রাষ্ট্রে তরুণ ও বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য বৃহৎ কর্মসংস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। ক্ষমতায় গেলে পর্যায়ক্রমে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে তরুণ–তরুণী ও নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাকে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন তিনি। দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের মধ্যে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড দেওয়া হবে; যার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হবে। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি ও তথ্যসেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষা অব্যাহত থাকবে। কর্মস্থলে ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন, নারীদের জন্য বিশেষায়িত বৈদ্যুতিক পরিবহন চালু, সাইবার বুলিং ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং শহরে নিরাপদ পাবলিক টয়লেট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সময়কালের নারী শিক্ষার অগ্রগতি আরও সম্প্রসারিত করা হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের অংশ হিসেবে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেন তিনি। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুযোগ রাখা হবে বলেও জানান। স্বাস্থ্যখাতে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতি গ্রহণ করে সারা দেশে এক লক্ষ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরেন; যাদের ৮০ শতাংশই নারী হবেন এবং তাঁরা ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন।
প্রশাসনে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির অঙ্গীকার করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার বন্ধ করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন সহজ হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ঘোষণাও দেন তিনি। এর মাধ্যমে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বিদেশগামী কর্মীদের জন্য জামানতবিহীন সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান।
ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নে তিনি বলেন, সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃসন্নিবেশিত করা হবে এবং “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—এই নীতিতে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ইমাম, মোয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে আবেগঘন কণ্ঠে দেশবাসীর কাছে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে ভিত্তি করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আপনাদের সমর্থন চাই।” তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান—তারুণ্যের প্রথম ভোট যেন ধানের শীষের পক্ষে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষণের মাধ্যমে তারেক রহমান একদিকে আত্মসমালোচনার বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে একটি বিস্তৃত সামাজিক–অর্থনৈতিক রূপরেখা সামনে এনে নির্বাচনী লড়াইকে নীতিনির্ভর বিতর্কের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা তাঁর এই অঙ্গীকার ও কর্মপরিকল্পনাকে কতটা গ্রহণ করেন।


















