নৌপথে পণ্য সরবরাহ করতে গিয়ে শ্যামল দাস হত্যাকাণ্ড: হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও নিরপেক্ষ বিচারের দাবিতে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ও প্রবাসীরা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
দীর্ঘ ১০ বছরের বিশ্বস্ততা, পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামের শ্যামল চন্দ্র দাস। নেসলে ডিস্ট্রিবিউটরের পণ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত এই সাধারণ কর্মজীবী মানুষটি গত ৩০ অক্টোবর শুক্রবার সকালে নৌপথে পণ্য নিয়ে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর ১ নভেম্বর রবিবার বিকেল ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার সলিমগঞ্জ এলাকায় নদী থেকে তাঁর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে শোক, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পরিবার, স্বজন, গ্রামবাসী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে।
শ্যামল চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি উঠেছে। গ্রামবাসী ও প্রবাসীদের বক্তব্য, কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি অসহায় পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি তাঁরা আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নিহত শ্যামল চন্দ্র দাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার ৩ নম্বর ওয়ার্ড, আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামের স্বর্গীয় প্রমোদ চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে নেসলে ডিস্ট্রিবিউটরের পণ্য সরবরাহের কাজে যুক্ত ছিলেন। প্রতি সপ্তাহে রায়পুরা ডিস্ট্রিবিউটর পয়েন্ট থেকে নৌকায় পণ্য নিয়ে আলোকবালি, বাখরনগর ও মুরাদনগর এলাকার বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করতেন।
দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নৌপথে যাতায়াতের সঙ্গী ছিলেন খোদাদিল্লা গ্রামের রেজন মিয়া ও তাঁর ছেলে। গত ৩০ অক্টোবর শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে রেজন মাঝির ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মনিপুরা ঘাট থেকে আলোকবালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন শ্যামল চন্দ্র দাস।
পণ্য সরবরাহের কাজ শেষে দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিটের দিকে তিনি ডিস্ট্রিবিউটর পয়েন্টে ফোন করে জানান, তাঁর কাজ শেষ হয়েছে এবং একই নৌকায় তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু এরপর থেকে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সময় গড়িয়ে বিকেল ও সন্ধ্যা হলেও তাঁর কোনো খোঁজ না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ডিস্ট্রিবিউটর পয়েন্টের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শ্যামল চন্দ্র দাসের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাঁর দীর্ঘদিনের যাতায়াতের সঙ্গীদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু হয়। ডিস্ট্রিবিউটর পয়েন্টের লোকজন রেজন মাঝির বাড়িতে গেলে তাঁর ছেলে জানান, দুপুর ১টার দিকে শ্যামলকে খোদাদিল্লা ঘাটে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ শ্যামলের নিয়মিত ফেরার কথা ছিল মনিপুরা ঘাটে।
পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় রেজন মাঝির ছেলে শ্যামলকে মেঘনা নদীর মাঝপথে নীলক্ষার কয়েকজন ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পণ্য সরবরাহের পর শ্যামলের কাছে থাকা অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং অপরাধের সঙ্গে প্রত্যেকের সম্পৃক্ততা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর ১ নভেম্বর রবিবার বিকেল ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার সলিমগঞ্জ এলাকায় নদী থেকে শ্যামল চন্দ্র দাসের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একজন পরিশ্রমী ও সাধারণ কর্মজীবী মানুষের এমন নির্মম পরিণতি স্থানীয় জনমনে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে পরিচিত মানুষের সঙ্গে নৌপথে যাতায়াত করেছেন শ্যামল। সেই পরিচিতি ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যদি তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, সমগ্র সমাজের জন্য ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়।
একজন মানুষ প্রতিদিনের জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে বেরিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন না—এমন পরিস্থিতি কোনো সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না।
শ্যামল চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন গ্রামবাসী ও প্রবাসীরা। তাঁদের দাবি, তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি বা পক্ষপাতিত্ব যেন না থাকে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, ভূমিকা ও দায় যথাযথভাবে তদন্ত করে আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রামবাসীদের জোরালো দাবি, প্রশাসন যেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং জনগণের সামনে প্রমাণ করে যে আইনের চোখে সবাই সমান। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা প্রভাব কোনোভাবেই বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।
প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অথচ দেশের একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়ে প্রাণ হারালে তা প্রবাসীদের মনেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
প্রবাসীদের দাবি, শ্যামল চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাঁরা অপরাধীদের সর্বোচ্চ আইনসম্মত শাস্তি দাবি করেছেন।
একই সঙ্গে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
শ্যামল চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা নয়, এটি জননিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা সমাজে অপরাধীদের সাহস জোগায়, অন্যদিকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচার মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনে। তাই এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হতে হবে পেশাদার, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণের সুযোগ নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শ্যামল চন্দ্র দাসের পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই দায়িত্ব প্রশাসন, তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও প্রবাসীরা।
নিহত শ্যামল চন্দ্র দাসের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তাঁরা বলেন, আমরা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চাই। আমরা চাই, অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার হোক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, একটি অসহায় পরিবার ফিরে পাক তাদের ন্যায়বিচারের অধিকার।



















