এক সপ্তাহেই যুদ্ধ জিততে পারতাম: দাবি ডোনাল্ড ট্রাম্পের
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারতেন। একইভাবে আফগানিস্তানের সংকটও এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব ছিল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এক নির্বাচনী সমাবেশে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধে সাবেক মার্কিন প্রশাসনগুলোর সামরিক কৌশলের সমালোচনা করেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিয়েতনামের তৎকালীন রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক অসংগতি উঠে এসেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় দেশটির রাজধানী এবং যুদ্ধরত পক্ষগুলোর অবস্থান নিয়ে তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন ইতিহাস বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা।
‘হো চি মিন ও অন্য শহরগুলোতে হামলা করা উচিত ছিল’
সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি চাইলে এক সপ্তাহের মধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ জিততে পারতেন।
যুদ্ধে ব্যবহৃত বিতর্কিত রাসায়নিক পদার্থ এজেন্ট অরেঞ্জ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, বনাঞ্চলে রাসায়নিক ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে হো চি মিন ও অন্যান্য শহরে হামলা চালানো উচিত ছিল।
এ সময় আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়েও আগের মার্কিন প্রশাসনের কৌশলের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই সংকটও এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব ছিল।
ইতিহাসের ভুল ধরিয়ে দিলেন নেটিজেনরা
ট্রাম্পের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।
সমালোচকদের মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় হো চি মিন সিটির নাম ছিল সায়গন। শহরটি ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী। আর দক্ষিণ ভিয়েতনাম ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র।
অন্যদিকে উত্তর ভিয়েতনামের রাজধানী ছিল হ্যানয়। উত্তর ভিয়েতনামই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ।
একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ব্যঙ্গ করে লেখেন, ট্রাম্প কি তাহলে দক্ষিণ ভিয়েতনামেরই সদর দপ্তরে বোমা হামলা করতে চেয়েছিলেন?
আরেকজন মন্তব্য করেন, সে সময় সায়গন দক্ষিণ ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেখানে মার্কিন সেনারাও অবস্থান করছিলেন। ফলে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের মিত্রকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করত।
আগেও ভিয়েতনাম যুদ্ধ জয়ের দাবি করেছিলেন ট্রাম্প
ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে এমন দাবি এবারই প্রথম করেননি ট্রাম্প। প্রায় দেড় বছর আগেও তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতায় থাকলে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ করতে পারতেন।
বাস্তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম দীর্ঘ ও জটিল সামরিক সংঘাত। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চলা এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সামরিক শক্তি ও অর্থ ব্যয় করেও নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনারা ভিয়েতনাম থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতন ঘটে।
যেভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র
ভিয়েতনামের স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়েছিল ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে।
১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট নেতা হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু ফ্রান্স আবারও দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে ১৯৪৬ সালে প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফু যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের পর জেনেভা চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়।
১৭তম অক্ষরেখা ধরে বিভক্ত দেশটির উত্তরে কমিউনিস্ট শাসিত উত্তর ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা শুরু হয় প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের সময়। পরবর্তী সময়ে ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ও জন এফ কেনেডির আমলে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হয়।
১৯৬৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নো দিন দিয়েম সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। এতে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়।
১৯৬৫ সালে সরাসরি যুদ্ধে নামে মার্কিন সেনারা
প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেয়।
১৯৬৪ সালের টংকিন উপসাগরের ঘটনার পর মার্কিন কংগ্রেস সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দেয়।
১৯৬৫ সালের মার্চে মার্কিন স্থলসেনারা ভিয়েতনামে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে উত্তর ভিয়েতনামে ব্যাপক বোমা হামলা শুরু হয়।
১৯৬৮ সালের টেট আক্রমণ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। উত্তর ভিয়েতনামের সেনা ও ভিয়েত কংয়ের এই আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়। ওই বছর জনসন পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন।
১৯৭৫ সালে পতন হয় দক্ষিণ ভিয়েতনামের
১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ভিয়েতনামাইজেশন নীতি গ্রহণ করেন। এর আওতায় মার্কিন সেনা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে কম্বোডিয়া ও লাওসেও।
১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে প্যারিস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পর ওই বছরের মার্চের মধ্যে মার্কিন যুদ্ধসেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
কিন্তু সংঘাত থামেনি। ১৯৭৫ সালের মার্চে উত্তর ভিয়েতনাম চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরু করে।
৩০ এপ্রিল সায়গনের পতনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পরাজয় ঘটে। পরে ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত হয় ভিয়েতনাম।
দীর্ঘ দুই দশকের সংঘাতের অবসান ঘটে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সামরিক সম্পৃক্ততা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, জাগোনিউজ



















