Logo

আন্তর্জাতিক    >>   চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিতে ব্যর্থতা, ক্ষোভ সনাতনী মহলে

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিতে ব্যর্থতা, ক্ষোভ সনাতনী মহলে

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিতে ব্যর্থতা, ক্ষোভ সনাতনী মহলে

গোপাল স্যানাল:

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ঘটনা আজ আর কেবল একজন ব্যক্তির মামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার অবশ্যই আইনের আওতায় হতে হবে; একই সঙ্গে তার ন্যায্য বিচার, আইনি অধিকার এবং মানবিক মর্যাদাও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ একাধিক মামলা রয়েছে। চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর সংঘর্ষে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হওয়ার ঘটনায়ও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সেই মামলার বিচার চলছে। বিভিন্ন মামলায় জামিনের বিষয়টি আদালতে ওঠার পরও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় তাঁর মুক্তি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকা মানেই তিনি অপরাধী প্রমাণিত হয়ে গেছেন, এমন নয়। আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত আইনের মৌলিক নীতি হলো নিরপেক্ষ বিচার এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ। একইভাবে, একজন অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা করা মানে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির ন্যায়বিচারের দাবি অস্বীকার করা নয়। প্রকৃত ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সব পক্ষের অধিকার সমানভাবে বিবেচিত হবে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিষয়টি আরও মানবিক মাত্রা পেয়েছে তাঁর মায়ের মৃত্যুর ঘটনায়। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। পরে মায়ের মৃত্যুর পর তাঁকে সীমিত সময়ের জন্য প্যারোলে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। একজন সন্তানের জীবনে মায়ের শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকা নিছক আইনি বিষয় নয়; এটি গভীর মানবিকতার বিষয়। কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও তার মানবিক অধিকার পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় না।

আমার প্রশ্ন এখানেই—ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সনাতনী সম্প্রদায়ের অসংখ্য সংগঠন রয়েছে। মন্দির রয়েছে, সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে, পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। তাহলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কেন আরও দৃশ্যমান হবে না?

কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারপ্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা সমাধান নয়। কিন্তু মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা একটি বৈধ ও গণতান্ত্রিক উদ্যোগ। ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি ও সনাতনী সংগঠনগুলো চাইলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম, কূটনৈতিক মিশন এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে।

আমাদের প্রবাসী সমাজে প্রতিবাদ আছে, উদ্বেগ আছে, সংগঠন আছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। কেউ বিবৃতি দিচ্ছেন, কেউ সমাবেশ করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু এসব উদ্যোগকে যদি একটি দীর্ঘমেয়াদি, তথ্যভিত্তিক ও আইনসম্মত মানবাধিকার কার্যক্রমের আওতায় আনা যায়, তাহলে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন সময়ের সহিংসতার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীদের বিচার হতে হবে; অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে সেটিও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে। গুজব, অতিরঞ্জন কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণা কোনোভাবেই সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার সহায়ক হতে পারে না।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবি যারা করছেন, তাদের পাশাপাশি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার বিচারও নিশ্চিত করার দাবি থাকতে হবে। কারণ একজনের ন্যায়বিচার অন্যজনের ন্যায়বিচারকে বাতিল করতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও ন্যায্য বিচার সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত অত্যন্ত পরিষ্কার—অপরাধ করলে বিচার হবে, কিন্তু সেই বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনের বিধান অনুযায়ী। ধর্ম, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান কোনো নাগরিকের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।

আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ। প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক প্রতিবাদ, আইনি সহায়তা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং মানবিক কূটনীতি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত সনাতনী সমাজ যদি সত্যিই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদের পরিবর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

শুধু চিন্ময় কৃষ্ণ দাস নয়—বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সোচ্চার হতে হবে। কারণ ন্যায়বিচার কোনো ধর্মের সম্পত্তি নয়। মানবাধিকার কোনো সম্প্রদায়ের একক অধিকার নয়। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের নিরাপত্তা তার সবচেয়ে মৌলিক অধিকার।

আজকের দাবি তাই একটাই—সত্য উদঘাটিত হোক, নিরপেক্ষ বিচার হোক এবং বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত হোক।

কলামিস্ট—গোপাল স্যানাল
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক, ইউএসএ।