রংপুরের হত্যাকান্ড পরিকল্পিত না কি হিন্দু শুন্য করার নীল নকশা?
প্রফেসর চন্দন সরকার:
Convention Against Torture and Other Cruel, Inhuman- এর জন্য UN-এর ১৯৮৪ সালের এক আইন আছে, তাতে এই আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে এবং দেশ এই Cruel, Inhumanর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান করবে, এই কথা UN – চার্টারে বলে রয়েছে । কিন্তু কথা হচ্ছে যদি রাস্ট্রযন্ত্র নিজেই মানুষদের ট্রর্চার করে তার বিচার কে করবে? আর রাষ্ট্র নিজেই হিন্দুদের উপর এই অপরাধ গুলোই করেই যাচ্ছে।
১৯৬৫ সাথে ইন্ডিয়া পাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ হলো কিন্তু বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্থানের হিন্দুদের জমি রাষ্ট্র করে ফেললো শ্ত্রু সম্পত্তি। ১৯৭১ সালে পাকিস্থান বেচে প্রথমে হিন্দুদের হত্যা করা শুরু করলো। হিন্দুরারা যে জমি হারালো শ্ত্রু আর অর্পিত সম্পত্তির নাম করে তা আজো ৫৫ বছরের পর কোন সুরাহা হয়নি। সেই ধারাবাহিকতা চলমান। নিরাপরাধ সাধু চিন্ময় জেলে বন্দী, গাইবান্ধায় রাম মন্দির বানানো বন্ধ, রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড কি শুধুই একটি নিছক হত্যাকান্ড, স্বাভাবিক ঘটনা? না- এটি একটি পরিকল্পিত, নৃশংস ও সংগঠিত হত্যা।
একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারকে তাদের নিজ বাসভবনে ঢুকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। অথচ পুলিশ প্রশাসন কেদে কুদে অস্থির হচ্ছে। পুলিশ অবশ্যই কাঁদতে পারে কিন্তু তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হচ্ছে, মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী হলে যা হয় সেই রকম- এটা এক কথায় দায়িত্বে অবহেলা। পুলিশ কখনো ইয়াবা নিয়ে আসছে কখন জমির বিরোধ, কখনও বা ডাকাতি—এই সব কুৎসিত অজুহাত দিয়ে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সরকার এক ডিলে কয়েক পাখি শিকার করছে, ভারতে কোন মিছিল মিটিং হবে না কারন, মরেছে হিন্দু, পুলিশ হিন্দু, ডাকার হিন্দু আর যারা হত্যা করেছে তারাও সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস হিন্দু।
সব কিছুই যেন ছকে বাধা। যাদের সাথে সাথে গ্রেপ্তার করে পুলিশের দেওয়া জবানবন্দি এখন ভিত্তিহীন প্রমাণিত হচ্ছে। ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে কোনো মাদকের অস্তিত্ব মিলেনি, তবুও প্রথমে ইয়াবা সেবনের জেরে খুন বলে প্রচার করা হয়েছিল। পরে পুলিশের কাছ থেকে বলা হলো জমি বিরোধ, আবার বলা হলো প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা। কিন্তু কোনো তত্ত্বই টেকেনি—পুলিশের তদন্তে অসংলগ্নতা এতটাই স্পষ্ট যে মনে হয়, তারা ঘটনার সত্য গোপন করতে বারবার গল্প বদলেছে।
ঘটনার আগে গণপতি চক্রবর্তী যে মৃত্যুভয়েই দিন কাটাচ্ছিলেন, তা তাঁর আত্মীয়স্বজনরা স্পষ্ট জানিয়েছেন। মারা যাবার শেষের ১ মাসের উপর ধরে তিনি ঘর বন্ধ করে ঘুমাতেন, নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রকাশ করতেন। তবুও যখন তাঁর পুরো পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, তখন প্রশাসন মাদকসেবী দুই তরুণের কাজ বলে দায় এড়ালো। অথচ আট দিন পর ডোপ টেস্ট করায় মাদক পাওয়া যায়নি—ঘটনার পরপরই পুলিশের হাতে তারা ছিল, তখন কেন পরীক্ষা করা হলো না? কেন প্রথমে মাদকের দায়, পরে সেই গল্প ফেলে দেওয়া হলো? উত্তর একটাই—ঘটনার আসল রূপ ভিন্ন।
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ পোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, হত্যাকারীরা তাকে হত্যা করে সেখানেই ছিলেন, খাওয়া দাওয়া করেছেন। একজন এগিয়ে গেছেন তাকে প্রথমে খুন, পরে দবিতীয় তৃতীয় এবং শেষের আগেরজন বাচ্চাকে, মানে ধুরন্ধর- ০৩। এই কাজ মাদকসেবী তরুণের পক্ষে সম্ভব নয়—এটি করতে হলে বিদ্যুৎ লাইনের বিস্তারিত জ্ঞান থাকতে হয় তাও মাদক সেবী মাছ বিক্রেতার ছিল!, কখন বিদ্যুৎ আসবে না, কতক্ষণ অন্ধকার থাকবে—এমন পরিকল্পনা সাধারণ মানুষ করে না কিন্তু মাদক সেবী করে, পুলিশের এই প্রেস করফারেন্স নিয়ে প্রশন তলা উচিত। পুলিশ অনেক কিছুই এড়িয়ে গেছে হয়ত নিজেরা কাউকে বাচাতে চেস্টা করছে অথবা অন্যকিছু যার শিকর আরো অনেক গভীরে। তবুও পুলিশ বলেছিল অভিযুক্তরা ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন করছিল—ছাদে ওঠার পথেই তো মাদক সেবনের উপযুক্ত জায়গা ছিল, তাহলে কেন একে একে চারজনকে খুন করা হলো, কোনো প্রতিবেশী টেরও পেল না? আবার হত্যা করে সব কিছুতেই তালা দিয়ে চলে যায়। খুন করে তুচ্ছ ইয়াবা খাওয়াকে কেন্দ্র করে যা বাংলাদেশে যেখানে সেখানে পাওয়া যায়। আর এই সমস্ত মানুষ সবার সামনেই খায়, কাউকেই তোয়াক্কা করেনা। অথচ খুনিরা কত কিছু করেছে ঠান্ডা মাথায়। এই ঠান্ডা মাথাইয় যে প্লান করেছে তারাই এর সাথে জড়িত, ইয়াবা সেবীরা এই প্লান করতে পারে না।
এই হত্যা কান্ড নিয়ে সব জায়গায় সরব এবং গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে অনেক তথ্য উঠে এসেছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের একজন ডোম জানিয়েছেন, নিহত দুই নারীর শরীরে শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে এই ঘঠনা কিন্তু পুলিশ জানে না। যদি এই তথ্য সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু খুন নয়—ধর্ষণের পর হত্যা। আর এই নৃশংসতা ঘটেছে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের দুই নারীর উপর, নিরপরাধ এক পরিবারের উপর। যেখানে ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে, সেখানে পুলিশ প্রথমে বললো মাদকসেবনের জেরে খুন, পরে বললো জমি নিয়ে বিরোধ—কোনো সময়ই বলা হলো না যে নারীদের উপর যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো: কেন এই গুরত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখা হলো?
কেন ময়নাতদন্তের এই অংশটি প্রকাশ করা হলো না? কারা এই তথ্য চেপে রাখার নির্দেশ দিলো?
এতগুলো অসংলগ্নতা সত্ত্বেও রংপুর মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ তাড়াহুড়া করে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে সাফল্যের ঘোষণা দিয়েছিলেন। লাশ পুড়িয়ে ফেলেছেন আবার গনপ্রতির বাড়ি ঘর পানি দিয়ে ধুয়ে মুছে দিয়েছেন। অন্য কোথাও তা পাওয়া যাবে না, কিন্তু রংপুরের পুলিশ তা করেছে। মানবিক রংপুরের মাবুদ- পুলিশ! কিন্তু যে কারণে তিনি প্রথমে বক্তব্য দিয়েছিলেন, পরে নিজেই তা থেকে সরে গেছেন। এখন নতুন করে জমি সংক্রান্ত বিরোধের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সিদ্ধার্থর পরিবারের সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তীর জমি কেনাবেচা নিয়ে কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। বরং গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তোলা হয়নি, পেনশনের টাকাও পাওয়ার সুযোগ ছিল না—অর্থাৎ অর্থনৈতিক কারণেও খুন করা হয়নি।
তাহলে আসল কারণ কী? কেন একটি পুরো পরিবারকে এভাবে শেষ করে দেওয়া হলো?
কেন নারীদের শরীরে শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেল? কেন পুলিশ এই তথ্য গোপন রাখলো? এই প্রশ্নের উপর কোনদিন মিলবে না, কারন রাস্ট্রযন্ত্র যদি শ্ত্রু মনে করে তাহলে সব কিছুতেই নন্দঘোষরাই ফেসে যাবে, মারা যাবে।
এটি শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয় এটি এখন—এটি দেশের প্রতিটি সংখ্যালঘু হিন্দু নাগরিকের মনের কথা, অস্তিত্বের প্রশ্ন, নিরাপত্তার প্রশ্ন। যাদের ধরা হয়েছে তাদের ডোপ টেস্টে কোন মাদক পাওয়া যায়নি। পুলিশের কাছে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন?
এই জবানবন্দির কতটা সত্য? এই লোকদের পরিবারদের কেন হয়রানী করা হচ্ছে, সেখানে একজনের বাবা বলছে তার ছেলে দোষী হলে তার শাস্তি হবে। তাহলে কেন পুলিশ এত ভয় পেয়ে পরিবারের সদস্যদের হয়রানী করছে। এটা কি অন্য কোন মিন করছে না, হ্যা করছে- কারন এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অনেক রহস্য। তাদের কি চাপ দিয়ে বয়ান আদায় করা হয়নি? হলে তাদের কি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়েছিল, নিশ্চই নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাড়াহুড়োতে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা নষ্ট হয়েছে।
পুলিশ হয়ত প্রকৃত খুনিদের আরাল করছে। খুন করে খুনীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর নির্দোষদের ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। যে খুন করে সে পরের দিন কিভাবে নিশ্চিতভাবে ঘুমাতে পারে। তাদের গায়ের পোষাক কেন পুলিশের গায়ে ছিল তাদের পোষাক থাকবে? রংপুরের এই চার খুনের বিচার করার জন্য পুলিশের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই খুনের অবশ্যই স্টহিক বিচার হতে হবে, যদি না হয়, তাহলে বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না। দেশের বিচারহীনতা শুধু এই পরিবারকে নয়—পুরো হিন্দু সম্প্রদায়কে আরও অসহায় ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি করবে, যা করা হয়েছিল ১৯৬৫, সালে ১৯৭১ সালে হিন্দুদের নিধনের মাধ্যমে। প্রতিটা হত্যা একদিন ফিরে আসে, তাইতো এক সময়ে রাজাধিরাজকে অন্যের বাড়িতে পালিয়ে থাকতে হয়।
প্রফেসর চন্দন সরকার
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ এবং মানবাধিকারকর্মী ।



















