ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ চান ডোনাল্ড ট্রাম্প, হরমুজ নিয়ে বাড়ছে উত্তেজনা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, গত পাঁচ দশকে ইরানের কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে, তার জন্য তেহরানকে অর্থ দিতে হবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই দাবি জানান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এ বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করছে ইরান।
হরমুজ নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌযান চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধের মধ্যেই ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। দুই দেশের এই আলোচনা চললেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ক্ষতিপূরণের দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। একইভাবে গত ৫০ বছরে ইরানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ওয়াশিংটনও তেহরানের কাছে অর্থ চাইবে।
ইরানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি
ইরানে নিহতের সংখ্যা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত চার মাসে ইরানে ৫২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের পাশাপাশি ইরানে নিহত বেসামরিক ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হরানা) ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৭ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল। তাদের হিসাবে নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন ছিলেন বিক্ষোভকারী।
এ ছাড়া ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলায় নিহত ১৭ যুক্তরাষ্ট্রের নাবিকের পরিবারের জন্যও ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ওই হামলার জন্য আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছিল, ইরানকে নয়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির জন্যও ইরানকে দায়ী করার কথা বলেন।
হরমুজে কমেছে জাহাজ চলাচল
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে ওমানের সঙ্গে নতুন জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণ নিয়ে একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা জানিয়েছে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। দুই পক্ষ নতুন নৌপথের একটি মানচিত্র নিয়েও একমত হয়েছে। তবে কিছু কারিগরি বিষয় এখনো সমাধান করা বাকি।
নিরাপদ নৌচলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা এবং অপরাধ দমনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। বাঘাইয়ের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ নৌপথটিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। ইরান হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জুলাইয়ে অবরোধ পুনর্বহালের পর তারা ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং অন্তত দুটি জাহাজকে অকার্যকর করেছে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের কারণে ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
‘হরমুজের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে’
সোমবার হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেওয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রণালিটি মাইনমুক্ত করেছে এবং নৌপথ উন্মুক্ত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সামুদ্রিক পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১৫টি জাহাজ পার হলেও শনিবার তা কমে ১১টিতে এবং রোববার মাত্র ছয়টিতে নেমে আসে। তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি জাহাজ ইরান নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করেছে। আরও ১০টি জাহাজ এমন একটি পথে চলাচল করেছে, যেটিকে নির্দিষ্ট কোনো রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। সূত্র: আল-জাজিরা, জাগোনিউজ



















