লোডশেডিং, গ্যাস-সংকট ও দ্রব্যমূল্যে দিশেহারা মানুষ: মানবেতর জীবনযাপন করছে সাধারণ জনগণ
নয়ন বিশ্বাস রকি:
দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আজ নানা সংকটে বিপর্যস্ত। একদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। গ্রাম থেকে শহর, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত—প্রায় সর্বত্রই মানুষের মুখে স্বস্তির বদলে উদ্বেগ ও হতাশার কথা।
বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু ঘর অন্ধকার হয় না, থমকে যায় মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, ছোট ব্যবসা ও দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মজীবী মানুষের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমিকের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর।
গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। একই সঙ্গে রান্নার গ্যাসের সংকট এবং জ্বালানির বাড়তি খরচ পরিবারগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এখন নিত্যপণ্যের বাজার। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয়ের তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে।
একজন সাধারণ ক্রেতার ভাষায়, ১০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে তিনটি ব্যাগও ভরে না। আরেকজনের অভিযোগ, আগে ৫০০ টাকায় যে বাজার করা যেত, এখন একই ধরনের বাজার করতে প্রায় ১২০০ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। মাসের শুরুতেই যে অর্থ দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় বাজার করা হতো, এখন তা দিয়ে অর্ধেক প্রয়োজনও মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক পরিবারকে খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে, প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কমাতে হচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক খরচেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমলে শ্রমিকের কাজের সুযোগ কমে যায়। উৎপাদন ব্যাহত হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর পরিণতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হয়ে পড়ে এবং বেকারত্বের চাপ বাড়ে।
শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা বলছেন। কোথাও কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার অভিযোগও রয়েছে। তবে এই ধরনের তথ্যের সঠিক চিত্র জানতে সরকারি ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজন রয়েছে। বাস্তবতা হলো, কর্মসংস্থানের সংকট একটি পরিবারের আয়কে যেমন কমিয়ে দেয়, তেমনি বাজারের সামগ্রিক চাহিদাকেও দুর্বল করে।
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি আছে কি না—এসবও অর্থনীতির বাস্তব চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজ অনেক মানুষ প্রশ্ন করছেন—দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? মানুষের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী?
কেউ কেউ অতীতের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে গতি দেখেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার ধারাবাহিকতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। এই মূল্যায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার কষ্টকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
লোডশেডিং, গ্যাস-সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার।
মানুষ বড় কোনো বিলাসিতা চায় না। তারা চায় নিয়মিত বিদ্যুৎ, রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, সবার নাগালের মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম, নিরাপদ কর্মসংস্থান এবং পরিবারের জন্য একটি নিশ্চিন্ত জীবন।
তাই আজ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—স্বস্তি কবে ফিরবে?
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বাজারে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো, সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি।
কারণ একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু বড় বড় প্রকল্প নয়—সাধারণ মানুষ দিন শেষে কতটা স্বস্তিতে ঘরে ফিরতে পারছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরুক, বাজারে স্থিতিশীলতা আসুক, কর্মসংস্থান বাড়ুক এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট দূর হোক—এটাই আজ দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ।



















