দীপ্ত শপথ: দ্বিতীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা
নয়ন বিশ্বাস রকি:
বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও প্রত্যয়ের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে আমাদের পূর্বসূরিরা অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই প্রজন্মের উত্তরসূরি হিসেবে আজকের তরুণদেরও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার এবং নিজেদের দায়িত্ব নির্ধারণের সময় এসেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে। সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ও দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। অতীতের ভুল-ত্রুটি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কোন পথে এগিয়ে নেওয়া হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালে আমাদের সামনে একটি রাজনৈতিক প্রত্যয়—বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করা। এটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরার প্রশ্ন নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের অবকাঠামোগত রূপান্তরের যে অধ্যায় সৃষ্টি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। উন্নয়ন যেন কোনো ব্যক্তি বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির ভিত্তি হয়ে ওঠে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ওপর, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সহিংসতা নয়; বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; নির্বাচন হবে এবং জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং লাখো শহীদের আত্মত্যাগকে ধারণ করেই নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে। ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা হতে পারে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যও থাকতে পারে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা বা রাজনৈতিক স্বার্থে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তরুণদের দায়িত্ব হবে তথ্য, যুক্তি ও ঐতিহাসিক সত্যের ভিত্তিতে ইতিহাসকে ধারণ করা।
আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের হাতে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তথ্যপ্রযুক্তির শক্তি। তাই শুধু ফেসবুকে পোস্ট বা স্লোগান দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। গুজবের জবাব দিতে হবে যাচাই করা তথ্য দিয়ে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সম্মান করতে হবে এবং যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাখতে হবে।
১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর সেই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর দেশে ফেরার প্রশ্নটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে ইতিহাস, আবেগ ও রাজনৈতিক প্রত্যয়ের সঙ্গে যুক্ত।
আমাদের সামনে তাই প্রশ্ন—বাংলাদেশকে আমরা কেমন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই? আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকবে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, মানুষের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মর্যাদা পাবে এবং তরুণদের জন্য তৈরি হবে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।
শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের দাবিকে যারা রাজনৈতিকভাবে ধারণ করেন, তাদের আন্দোলনও হতে হবে শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক। জনগণের আস্থা অর্জন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিকে জনসম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়েই সেই প্রত্যয়কে এগিয়ে নিতে হবে।
আমাদের শপথ হোক—দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব। ইতিহাসের সত্যকে ধারণ করব, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করব এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে নিজেদের নিয়োজিত রাখব।
দ্বিতীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা তাই শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, একটি প্রত্যয়ের নাম।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা



















