Logo

আন্তর্জাতিক    >>   ওয়েলসের ডিভলিউশনের জনক রডরি মর্গানের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য উন্মোচন, কার্ডিফে শ্রদ্ধা ও স্মরণে ঐতিহাসিক আয়োজন

ওয়েলসের ডিভলিউশনের জনক রডরি মর্গানের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য উন্মোচন, কার্ডিফে শ্রদ্ধা ও স্মরণে ঐতিহাসিক আয়োজন

ওয়েলসের ডিভলিউশনের জনক রডরি মর্গানের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য উন্মোচন, কার্ডিফে শ্রদ্ধা ও স্মরণে ঐতিহাসিক আয়োজন

জেসমিন মনসুর, কার্ডিফ, ওয়েলস (যুক্তরাজ্য) থেকে:
ওয়েলসের প্রথম ফার্স্ট মিনিস্টার এবং ‘ডিভলিউশনের জনক’ হিসেবে খ্যাত রাইট অনারেবল রডরি মর্গানের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে কার্ডিফ বে-তে সেনেড (ওয়েলস পার্লামেন্ট) ভবন ও ঐতিহাসিক পিয়ারহেড বিল্ডিংয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে। 
গত ১১ জুলাই ২০২৬ শনিবার দুপুরে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠান ওয়েলসের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ আট বছরের পরিকল্পনা, তহবিল সংগ্রহ ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে নির্মিত এই ভাস্কর্য এখন থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একজন জনপ্রিয় নেতার স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং ওয়েলসের গণতান্ত্রিক বিকাশ ও ডিভলিউশন আন্দোলনের এক স্থায়ী প্রতীক।
সাবেক মন্ত্রী জেইন এলিজাবেথ হাটের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওয়েলস পার্লামেন্টের ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার সিওনেড উইলিয়ামস, সাবেক ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড, ফাইন্যান্স মিনিস্টার এলিন জোন্স, রডরি মর্গানের সহধর্মিণী জুলি মর্গান, সিনেড সদস্য হিউ টমাস, লেবার এমএস শাভ তাজ, ল্লুইড হিউ ইরাঙ্কা-ডেভিস, কার্ডিফের লর্ড মেয়র রাইট অনারেবল মাইকেল মাইকেল এবং রডরি মর্গান ট্রাস্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি কাউন্সিলর দিলওয়ার আলীসহ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের কেন্দ্রীয় কনভেনর ও কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ মকিস মনসুর, ওয়েলস বাংলাদেশ উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহমিনা খান, ‘রূপসী ওয়েলসের কোলে ছোট এক বাংলাদেশ’ গ্রন্থের লেখক ও সাংবাদিক দেওয়াল ফয়সাল, সৈয়দ জুয়েল রহমান, ভিপি সেলিম আহমেদ, আবুল কালাম মুমিনসহ কমিউনিটির আরও অনেক নেতৃবৃন্দ।
পিয়ারহেড বিল্ডিংয়ের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যে রডরি মর্গানকে তাঁর প্রিয় কুকুর ‘টেল’-এর সঙ্গে সেনেড ভবনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। সাধারণ পোশাকে এবং মাটির কাছাকাছি স্থাপিত এই ভাস্কর্য তাঁর বিনয়ী, জনঘনিষ্ঠ ও আড়ম্বরহীন রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নির্মিত হয়েছে।
ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে জুলি মর্গান বলেন, তাঁর স্বামী সবসময় সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসতেন। সেই কারণেই ভাস্কর্যটি কোনো উঁচু বেদিতে নয়, বরং মানুষের নাগালের মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে।
সাবেক ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড রডরি মর্গানকে ‘ডিভলিউশনের জনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ছাড়া সেনেড আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না।
ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার সিওনেড উইলিয়ামস বলেন, ডিভলিউশনের শুরুর অস্থির সময়ে রডরি মর্গানই ওয়েলসকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যান। তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং টানা নয় বছর সেই দায়িত্ব পালন করেন।
ফাইন্যান্স মিনিস্টার এলিন জোন্স বলেন, এটি শুধু মর্গান পরিবারের জন্য নয়, পুরো ওয়েলসের জন্যই একটি গৌরবময় দিন।
লেবার এমএস শাভ তাজ রডরি মর্গানকে শ্রমজীবী মানুষ ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ল্লুইড হিউ ইরাঙ্কা-ডেভিস বলেন, যাঁরা কখনো তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেননি, তাঁরাও তাঁকে আপনজন হিসেবেই অনুভব করতেন।
রডরি মর্গান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী বলেন, ছোট ছোট অনুষ্ঠান, নৈশভোজ এবং সারা ওয়েলসের মানুষের অনুদানের মাধ্যমে এই ভাস্কর্য নির্মাণের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
ইউকে বিডি টিভির চেয়ারম্যান ও ওয়েলস বাংলা নিউজের সম্পাদক মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, রডরি মর্গানের সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির ছিল গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং সহজ-সরল জীবনযাপন তাঁকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। তিনি বলেন, এই ভাস্কর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একজন জননেতার আদর্শ সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করবে।
ওয়েলস বাংলাদেশ উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহমিনা খান বলেন, রডরি মর্গান সবাইকে সমান মর্যাদায় দেখতেন। তাঁর এই ভাস্কর্য কার্ডিফ বে-এর সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি করবে, তেমনি দর্শনার্থীদের কাছে তাঁর অবদানও তুলে ধরবে।
লেখক ও সাংবাদিক দেওয়াল ফয়সাল বলেন, রডরি মর্গানের চুলের ধরন ও কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয়। মানুষ তাঁকে দেখলেই কথা বলতে এগিয়ে আসত, যা তাঁর জনপ্রিয়তারই বহিঃপ্রকাশ।
ভাস্কর্যটির নকশা করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাস্কর অ্যান্ডি এডওয়ার্ডস। তিনি ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে লিভারপুল ওয়াটারফ্রন্টে বিটলস ব্যান্ডের চার সদস্যের ভাস্কর্য, মোটরহেড ব্যান্ডের লেমির ভাস্কর্য এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ১৯১৪ সালের ঐতিহাসিক ‘ক্রিসমাস ট্রুস’ স্মারক ভাস্কর্য। রডরি মর্গানের এই ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছে পাউইসের লানরহায়াডর-ইম-মখনান্টে অবস্থিত ক্যাসল ফাইন আর্টস ফাউন্ড্রিতে।
রডরি মর্গান ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৯ সালে নবগঠিত ওয়েলস অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ওয়েলসের স্বতন্ত্র নীতি ও রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। ‘ক্লিয়ার রেড ওয়াটার’ নীতির মাধ্যমে তিনি ওয়েলসকে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশের নীতির বাইরে নিজস্ব পথ অনুসরণে উৎসাহিত করেন। ২০১৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন, এই ভাস্কর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রডরি মর্গানের গণতান্ত্রিক আদর্শ, জনসেবা ও রাজনৈতিক অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে এবং নতুন প্রজন্মকে জনকল্যাণমূলক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে ।