অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক: কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের মুক্তির আলোকবর্তিকা
এম এ আলীম সরকার:
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন আমাদের সময়ের এক বিরলপ্রজ মনীষী। তিনি ছিলেন শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যসমালোচক, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং সর্বোপরি একজন অসাধারণ মানবপ্রেমী। তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল, নির্লোভ ও নির্মোহ। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনো আকৃষ্ট করতে পারেনি। বরং তিনি আজীবন কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের মুক্তি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মানবকল্যাণের স্বপ্ন লালন করেছেন।
১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এক শিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মাতা জাহানারা খাতুন। শিক্ষাজীবনে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, আনন্দমোহন কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার যে ভিত্তি নির্মাণ করেন, তা পরবর্তী সময়ে তাঁকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করে। ছাত্রজীবনেই তিনি ভাষা আন্দোলনের চেতনা, প্রগতিশীল রাজনীতি এবং মুক্তচিন্তার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। মুনীর চৌধুরী, আহমদ শরীফ, নীলিমা ইব্রাহিমসহ বহু বিশিষ্ট শিক্ষকের সান্নিধ্য তাঁর চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা করে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শুধু পাঠ্যজ্ঞানই দেননি; শিখিয়েছেন মানবিকতা, যুক্তিবাদ, নৈতিকতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর শ্রেণিকক্ষ ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চার ক্ষেত্র, আর তাঁর বাসা ছিল জ্ঞানপিপাসু মানুষদের জন্য এক উন্মুক্ত আড্ডাকেন্দ্র। অতিথিপরায়ণতা, আন্তরিকতা এবং স্নেহশীল আচরণের জন্য তিনি সকলের কাছে ছিলেন আপনজন।
আমার ব্যক্তিগত জীবনে অধ্যাপক ফজলুল হকের স্থান ছিল পিতৃতুল্য। ২০০৬ সাল থেকে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করি। তিনি আমাকে লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন, ভুল ধরিয়ে দিতেন এবং সাহস জোগাতেন। তাঁর সান্নিধ্যে আমি উপলব্ধি করেছি—একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল জ্ঞান দেন না, তিনি মানুষও গড়ে তোলেন।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর একমাত্র ছেলে, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন নির্মমভাবে নিহত হন। সেই শোকের মুহূর্তে তাঁকে সান্ত্বনা জানাতে গেলে তিনি নিজের সন্তানের কথা নয়, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর বেদনা, কিন্তু প্রতিহিংসা ছিল না। তিনি বিচার দাবি করার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির জাগরণকে। সেই দৃশ্য আজও আমার হৃদয়ে অম্লান। এমন আত্মসংযম, মানবিকতা ও দেশপ্রেম সত্যিই বিরল।
অধ্যাপক ফজলুল হক ছিলেন বহুমাত্রিক লেখক। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর দুই ডজনেরও বেশি গ্রন্থ বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লোকায়ত পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন এবং নিয়মিত প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও কলামের মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরলসভাবে লিখেছেন। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে কৃষক-শ্রমিক, অবহেলিত মানুষ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার লাভ করবে। তাঁর দৃষ্টিতে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো ব্যবস্থা নয়; এটি মানুষের অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, নৈতিকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এ কারণেই তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন এবং নতুন রাজনৈতিক চিন্তা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অধ্যাপক ফজলুল হক মনে করতেন, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদ-পদবিতে নয়, বরং মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা, সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়। তিনি ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে আদর্শের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি ক্ষমতার প্রলোভনে পা বাড়াননি। আদর্শ ও নীতিকে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন।
তাঁর চিন্তা শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি বিশ্বমানবতার মুক্তির কথাও ভাবতেন। যুদ্ধ, বৈষম্য, শোষণ এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন লিখেছেন। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বপ্নই ছিল তাঁর চিন্তার মূল ভিত্তি।
আজকের বাংলাদেশে যখন রাজনীতি, সমাজ ও নৈতিক মূল্যবোধ নানা প্রশ্নের মুখোমুখি, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবন ও দর্শন নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষ বারবার জন্ম নেন না। তিনি ছিলেন বিবেকের কণ্ঠস্বর, মানবতার পথপ্রদর্শক এবং কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। তাঁর জীবন, কর্ম ও দর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যায়, মানবিকতা ও সত্যের পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগাবে। যতদিন বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি, মানবিকতা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, ততদিন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
এম এ আলীম সরকার
প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)



















