Logo

আন্তর্জাতিক    >>   আওয়ামী লীগের লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর অবরুদ্ধ জীবন: উৎসবের ঈদে বিষাদের হাহাকার

আওয়ামী লীগের লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর অবরুদ্ধ জীবন: উৎসবের ঈদে বিষাদের হাহাকার

আওয়ামী লীগের লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর অবরুদ্ধ জীবন: উৎসবের ঈদে বিষাদের হাহাকার

মানিক লাল ঘোষ:
ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতিতে ঈদ মানেই আনন্দ, ভালোবাসা, আত্মীয়-স্বজনের মিলনমেলা এবং সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির এক অনন্য উপলক্ষ। কিন্তু যখন চারদিকে ঈদের আনন্দধ্বনি, নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাস আর প্রিয়জনদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুখ ছড়িয়ে পড়ার কথা, তখন দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ঘরে ঘরে বিরাজ করছে গভীর বিষাদ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য নেতা-কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ী এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের অনেকেই আজ নিজ দেশে থেকেও যেন পরবাসী। কেউ দেশান্তরী, কেউ আত্মগোপনে, কেউবা মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছেন। যে ঘরে ঈদের আনন্দ থাকার কথা, সেই ঘরে আজ কান্না, উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীর কারাবন্দি জীবন। অনেক পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কারাগারে থাকায় তাদের স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যেসব পরিবারে বাবা, ভাই কিংবা সন্তান কারাবন্দি অথবা নিখোঁজ, তাদের কাছে ঈদের সকাল আর দশটি দিনের চেয়েও বেশি বেদনাময়। ঈদের নামাজ, সেমাই কিংবা নতুন পোশাক—কোনো কিছুই তাদের হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।
একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু মতাদর্শগত বিরোধ কখনো মানবিক মূল্যবোধকে অস্বীকার করতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজ এমন অনেক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পরিবারগুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব গভীর উদ্বেগের বিষয়। যে বয়সে তাদের হাতে বই-খাতা ও খেলনা থাকার কথা, সেই বয়সে তারা আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং বিচ্ছেদের কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ঈদের আনন্দ মূলত মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু যখন পরিবারের কোনো সদস্য কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা নির্বাসনে থাকেন, তখন উৎসবের আনন্দও ম্লান হয়ে যায়। অসংখ্য মা আজ সন্তানের অপেক্ষায়, অসংখ্য স্ত্রী স্বামীর ফেরার প্রহর গুনছেন, অসংখ্য সন্তান বাবার স্নেহবঞ্চিত অবস্থায় ঈদ পালন করছে। তাদের চোখের জল ও দীর্ঘশ্বাস জাতীয় জীবনের এক গভীর মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—দমন-পীড়ন, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কখনো স্থায়ী হয়নি। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে দেখা গেছে, সংকটের সময় পেরিয়ে নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। সত্য, ন্যায় এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন কখনো চিরকাল চাপা থাকে না।
আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী বিশ্বাস করেন, দলের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই তাদের বর্তমান দুর্দশার অবসান ঘটবে এবং তারা নতুন করে আশার আলো দেখতে পাবেন। সেই প্রত্যাশা ও বিশ্বাস নিয়েই তারা প্রতিকূল সময় অতিক্রম করছেন।
ঈদের এই পবিত্র সময়ে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার প্রশ্নটি সামনে আসা জরুরি। রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে না।
ঈদের শিক্ষা হলো ক্ষমা, সহমর্মিতা, ত্যাগ এবং মানবকল্যাণ। সেই চেতনা যদি আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হয়, তবে একদিন সব অন্ধকার দূর হবে, সব বিভেদ মুছে যাবে এবং ন্যায়, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সহনশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশাই আজ সময়ের দাবি।
মানিক লাল ঘোষ 
সাংবাদিক ও কলামিস্ট; সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।