Logo

আন্তর্জাতিক    >>   ২০ মাসে বাংলাদেশে বৈষ্যমের কতটা অবসান হলো?

২০ মাসে বাংলাদেশে বৈষ্যমের কতটা অবসান হলো?

২০ মাসে বাংলাদেশে বৈষ্যমের কতটা অবসান হলো?

সাজ্জাদ হোসেন সবুজ:

 ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কথিত যে ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল তার কারণ হিসেবে অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণ ও সরকারি চাকুরিতে মাত্রাতিরিক্ত কোটা সংরক্ষণকে দায়ী করেছিলেন। এই দাবীতে বুঝে হোক না বুঝে হোক দেশের বহু মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রক্তপাত এড়াতে ওই বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।

 "আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই", এই স্লোগান নিয়েই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। ঘটনা পরম্পরায় যা গড়ায় সরকার পতনের আন্দোলনে। 

 এই আন্দোলন সত্যিকার অর্থে কোন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন ছিল না, এটা ছিল যড়ষন্ত্র তথা মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধীদের সরকার উৎখাতের আন্দোলন এবং এই নীল নকশার সাথে দেশি-বিদেশি অপশক্তি যে জড়িত ছিল পরে তা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে দেশের সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।

 দেশ পরিচালনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং অযোগ্যতার কারণে দেশের প্রতিটি সেক্টর এখন ধ্বংসের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিচার বিভাগ, ক্রীড়াসহ প্রতিটি সেক্টরেই এখন ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। যার ফলে সাধারণ মানুষ এখন অন্তহীন দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশার মধ্যে দিনযাপন করছে। শত শত কলকারখানা বন্ধ হওয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়েছে। কাজের অভাবে বহু মানুষ গ্রামে ফিরে গেছে এবং দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বর্তমানে পৌঁছেছে ৩ কোটি ৬০ লাখে। 

 আসুন দেখি কতটা বৈষম্য ও দলীয়করণের অবসান হয়েছে এই সময়ের মধ্যে। ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনীতি, দুর্নীতি, চাকরি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলো বন্ধ হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ বেড়েছে বলে বিবিসি রিপোর্ট করেছে। এমনকি আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টরাই জুলাইকে 'মানিমেকিং মেশিন' হিসেবে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ উঠছে।

 এমন প্রেক্ষাপটে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক কাঠামোতে আদৌ কতটা পরিবর্তন হলো? বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার কিংবা জুলাই আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউই বৈষম্য দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। ফলে অপরিবর্তিত কাঠামোতে বহাল রয়েছে পুরনো ব্যবস্থা।  
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী নানা বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া হলেও আসলে তা দূর হয়নি। বরং ছাত্র নেতৃত্বের যারা সরকারে গেছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে তাদের বিরুদ্ধেও। 

 "বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন পাঁচ অগাস্টের পরে কোটার আঁতুড়ঘর হয়ে গিয়েছিল। ভাই, বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র ইত্যাদি কোটায় মানুষজনকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও কমিটিতে পদ-পজিশন দেয়া হচ্ছিলো। আর যারা তথাকথিত ফেইস হয়েছিল তারা ব্যতীত বাকি কারো কথা কোরামে কখনোই শোনা হতো না", বিবিসিকে বলেন আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত একজন সহ-সমন্বয়ক। 

 বর্তমানে ক্রিকেট বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার একটি, আরেকটি হচ্ছে ফুটবল। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচনে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না; এমন অভিযোগে সোমবার ভেঙে দেওয়া হয়েছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ।

 ৩ মাসের জন্য গঠন করা হয়েছে বিসিবির অ্যাডহক কমিটি। সেই কমিটির সদস্য সংখ্যা ১১ জন। অ্যাডহক কমিটির প্রধান করা হয়েছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা ওপেনার তামিম ইকবালকে। তামিম ইকবালকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে সেটা নয় ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এর সদস্যদের নিয়ে।  
গঠিত সেই ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটিতে আছেন তিনজন ক্রিকেটার, তিনজন মন্ত্রীর ছেলে এবং প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী। পাঁচজনের বাড়ি আবার চট্টগ্রামে।  তামিম ইকবাল ছাড়া বাকি দুই ক্রিকেটার হলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু এবং সাবেক ক্রিকেটার আতহার আলী খান যিনি বর্তমানে ধারাভাষ্য পেশায় জড়িত। 

 কমিটির অন্য তিন সদস্য মির্জা ইয়াসির আব্বাস প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রী পদমর্যাদার রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে এবং ইসরাফিল খসরু অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে। এছাড়া রাশনা ইমাম প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী। এই চারজন সদস্য কোন যোগ্যতাবলে ক্রিকেট বোর্ডে স্থান পেয়েছেন তা নিয়ে জনগণ বিশেষ করে খেলাধুলার সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের কথা হচ্ছে এই চারজন ক্রিকেটের পরিচয়ে নয়, তারা মূলত: কমিটিতে এসেছে দলীয় পরিচয়ে অর্থাৎ তারা উপদেষ্টা, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ছেলে ও স্ত্রী। 

 এই প্রসঙ্গে আদনান ওয়ালিদ রাতুল নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন— “আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেভাবে অলিগার্কি বা ধনিক শ্রেণির আধিপত্য কায়েম হয়েছে, তার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি আমরা দেখলাম সদ্য গঠিত বিসিবির অ্যাডহক কমিটিতে। আমিনুল ইসলাম বুলবুল সাহেব-এর পূর্ববর্তী বোর্ডকে অবৈধ ঘোষণা করা হলো, আমরা হয়তো ভেবেছিলাম অন্তত ক্রিকেটের মতো একটা জায়গায় এবার শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে।”  

কিন্তু জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা আমাদের কী উপহার দিল? 

 রাতুল লিখেছেন এই কমিটির সদস্যদের প্রোফাইল যদি আপনারা একটু চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, তাহলে আপনাদের মনে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন জাগবে - এটা কি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নাকি ‘ব্যাংক ক্রিকেট বোর্ড’? নাকি ব্যাংকার আর কর্পোরেটদের কোনো নতুন সিন্ডিকেট? একটু লক্ষ্য করুন, সভাপতি হিসেবে তামিম ইকবালের মতো একজন ক্রিকেটারের নামটা সামনে রেখে, পেছনে কেমন সুনিপুণভাবে একটা কর্পোরেট ও রাজনৈতিক বলয় তৈরি করা হয়েছে।

 প্রথমেই ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের কথা ধরুন। ববি হাজ্জাজের স্ত্রী এবং প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার আখতার ইমামের কন্যা তিনি। তাদের পারিবারিক ল-ফার্ম দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর - এমনকি খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি পরামর্শদাতা। তার শ্বশুর ধনকুবের মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে রূপালী ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণের নেপথ্যের সেই পুরনো অভিযোগ কারোরই অজানা নয়। একটি স্পোর্টস বোর্ডের নীতিনির্ধারণী জায়গায় এমন কারোর উপস্থিতি কি সরাসরি 'কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট' বা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে না? 

 এরপর দেখুন মির্জা ইয়াসির আব্বাসকে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বড় ছেলে তিনি। তিনি ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে আছেন, যে ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা স্পনসর তার পিতা এবং যেখানে তাদের পরিবারের শত কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে।

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের পুত্র সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদও আছেন এই তালিকায়। সরাসরি মালিকানা না থাকলেও, তার ভগ্নিপতির লন্ডন সিটি ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে থাকা এবং এস আলম গ্রুপের মতো বিতর্কিত গোষ্ঠীর সাথে তার পরিবারের যোগাযোগের অভিযোগগুলো কি আমরা এড়িয়ে যেতে পারি? তালিকা এখানেই শেষ নয়।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরুকেও আনা হয়েছে। যে পরিবারের শেকড় সোনালী ব্যাংক আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের গভীরে প্রোথিত। আছেন তানজীম চৌধুরী, যিনি আজম জে. চৌধুরীর পুত্র এবং বর্তমানে প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে ‘পরিবারতন্ত্রের’ ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত তারা। সালমান ইস্পাহানির মতো এম.এম. ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যানও আছেন, ঐতিহাসিকভাবে যাদের পরিবার পাকিস্তানের MCB ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাহিদা ইস্পাহানি ব্র্যাক ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

 আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ফাহিম সিনহা! তিনি জাতীয় পর্যায়ের বিলিয়ার্ড খেলোয়াড় হতে পারেন, কিন্তু তার আসল পরিচয় তিনি অ্যাকমি গ্রুপের ডিরেক্টর। নাজমুল হাসান পাপন, ফারুক আহমেদ থেকে শুরু করে আমিনুল ইসলাম বুলবুল - সভাপতি যেই আসুক না কেন, বিসিবির টাকার চাবি এই ফাহিম সিনহার হাতেই থাকতে হবে। টানা তিন আমলেই তিনি ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান। যদিও আমিনুল ইসলাম বুলবুল নির্বাচিত হওয়ার পর এম নাজমুল ইসলামকে দায়িত্ব তুলে দেন। বোর্ডের আর্থিক খাতে একজন ব্যক্তির এই একচ্ছত্র আধিপত্যের খুঁটির জোর আসলে কোথায়? জবাবদিহিতা কি এখানে একেবারেই নির্বাসিত? 

 নান্নু, আতাহারদের মতো সাবেক ক্রিকেটারদের এখানে হয়তো রাখা হয়েছে কেবল 'আইওয়াশ' হিসেবে। গতকাল যখন এই তালিকা প্রকাশ পেল, রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের এই রমরমা উপস্থিতি দেখে প্রথমে হয়তো অনেকের মনে হয়েছিল এটা বুঝি ‘বিএনপি ক্রিকেট বোর্ড’ হতে যাচ্ছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে আসল সত্যটা বেরিয়ে আসে। এখানে রাজনীতিটা কেবল একটা মুখোশ, আসল খেলাটা হলো কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ের। 

 রাতুল লিখেছেন দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে এই ক্রিকেটের সাথে। কিন্তু আজ সেই ক্রিকেট মাঠের লড়াই আর ২২ গজে সীমাবদ্ধ নেই, তা সম্পূর্ণভাবে বন্দি হয়ে গেছে কর্পোরেট ব্যাংকার আর অলিগার্কদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টেবিলে।জবাবদিহিহীনতার যে ভয়াল সংস্কৃতি এই রাষ্ট্রকে গিলে খেয়েছে, বিসিবির এই ‘ব্যাংক-সিন্ডিকেট’ যেন তারই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। এই অলিগার্কিক কাঠামোর ভাঙন ছাড়া এদেশের ক্রিকেটের কোনো মুক্তি নেই। 

 এবার তাকানো যাক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের দায়িত্বকালেই এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। 

 বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত ৫৪৭ দিনে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৪২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি নিয়োগের নজির নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জানা গেছে, মাত্র পাঁচটি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে এসব নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। প্রতিটি সভায় গড়ে প্রায় ৮৫ জনের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়াও একুশে ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় ছুটির দিনেও সিন্ডিকেট বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

 নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে নিয়োগ বোর্ড গঠন থেকে শুরু করে নীতিমালা পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। উপ-উপাচার্যের মেয়ে, আরেক উপ-উপাচার্যের সহগবেষক, রেজিস্ট্রারের ভাই এবং হল প্রভোস্টদের পরিবারের সদস্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। 

 এদিকে কর্মকর্তা নিয়োগে নীতিমালা না মানার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মো. ইব্রাহিম কবীর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেছেন। রামেবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভিসি জাওয়াদুল হক কর্মকর্তা নিয়োগের কোনো নীতিমালা মানেননি। 

নীতিমালা লঙ্ঘন করে তিনি শুধু ইব্রাহিম কবীরকেই নিয়োগ দেননি, অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন রেজিস্ট্রার হাসিবুল হোসেন, কলেজ পরিদর্শক আবদুস সালাম, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাহ আলম, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) নজিবুর রহমান, উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) আশরাফুল ইসলামসহ মোট ৯ জন। 

 পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) এবং পরিচালকের (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে একটি নীতিমালা করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এতে বলা হয়েছে, স্থায়ী নিয়োগের জন্য অন্তত দুবার জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও যদি উপযুক্ত জনবল না পাওয়া যায়, তবেই সিন্ডিকেট চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পদের জন্য যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে ইউজিসি থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটিতে ইউজিসি চেয়ারম্যানের মনোনীত একজন প্রতিনিধিও থাকতে হবে। 

 এই নীতিমালা অনুসরণ না করে ভিসি নিয়োগ দিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৬ দেখিয়ে। এ আইনের ধারা ১৩-এর উপধারা ১০-এ বলা আছে, ভিসি শিক্ষক, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও কোষাধ্যক্ষ বাদে অন্য পদে ছয় মাসের জন্য সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে পারবেন। প্রয়োজনে নিয়োগের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়াতে পারবেন। কিন্তু বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে নিয়োগ নিয়মিত করা না হলে ওই মেয়াদ শেষে নিয়োগ বাতিল বলে গণ্য হবে। কিন্তু ভিসির নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরিতে আছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

 বিসিবি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিটি জায়গায় এই অনিয়ম, বৈষম্য, দলীয়করণ এবং দুর্নীতির বিস্তার হয়েছে গত ২০ মাসে এবং যা এখনও অব্যাহত আছে। সুতরাং যে আশা বা মূলা ঝুলিয়ে বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাত্রদের রাজপথে নামানো হয়েছিল সেটি আজ সুদূর পরাহত এবং ছাত্রদের এই স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়িত হবে কিনা এব্যাপারে বলতে গেলে অধিকাংশই সন্দিহান । 

 "আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই" ছাত্রদের এই স্লোগান বাস্তবে রূপ নেবে নাকি স্লোগানই থেকে যাবে সেটি কেবল ভবিষ্যতই বলতে পারে! 

সাজ্জাত হোসেন সবুজ, 
সিনিয়র সাংবাদিক এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার।