Logo

আন্তর্জাতিক    >>   বেদনার ঈদ, রাজনীতির নির্মম ছায়া: আতঙ্ক-অনিশ্চয়তায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উৎসবহীন সময়

বেদনার ঈদ, রাজনীতির নির্মম ছায়া: আতঙ্ক-অনিশ্চয়তায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উৎসবহীন সময়

বেদনার ঈদ, রাজনীতির নির্মম ছায়া: আতঙ্ক-অনিশ্চয়তায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উৎসবহীন সময়

নয়ন বিশ্বাস রকি:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঈদ সবসময়ই ছিল আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই চিরচেনা আনন্দ আজ অনেকের জীবন থেকে যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীর জন্য এবারের ঈদ আর উৎসবের নয়—বরং বেদনা, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
একসময় যারা ঈদের আগমনে নিজ নিজ এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, গরিব-দুঃখীদের সহায়তায় এগিয়ে যেতেন, ঈদের জামাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করতেন—আজ তাদের অনেকেই নিজ ঘরেই নিরাপদ নন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় কেউ কারাগারে, কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ মামলা-হামলার ভয়ে আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে ঈদের সেই চিরচেনা হাসি আজ তাদের ঠোঁটে অনুপস্থিত।
ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, নতুন পোশাক, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা, কোলাকুলি আর ভালোবাসার উচ্ছ্বাস। অথচ যে কর্মীটি বছরের পর বছর দলকে সময় দিয়েছেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন, মানুষের দুঃখে পাশে থেকেছেন—তিনি আজ হয়তো ঈদের দিনেও সন্তানের মুখ দেখতে পারছেন না। মায়ের হাতের রান্না, বাবার স্নেহমাখা দোয়া—সবই যেন আজ দূরের স্মৃতি।
অনেক পরিবারে ঈদের দিনেও নেমে এসেছে নীরবতা। মা অপেক্ষা করছেন সন্তানের জন্য, স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর জন্য, সন্তানেরা অপেক্ষা করছে বাবার জন্য—কিন্তু কেউই ফিরছেন না। মামলা, হামলার আশঙ্কা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা তাদের ঘরে ফেরার পথকে করেছে অনিশ্চিত। এই অপেক্ষা, এই অজানা শঙ্কাই হয়ে উঠেছে তাদের ঈদের বাস্তবতা।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই চক্র নতুন নয়। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি, মামলা, গ্রেপ্তার—এসব যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ধারাবাহিকতা কি আমাদের প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে পারবে?
যে দেশে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, সেখানে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধও থাকতে হবে। ভিন্ন মত মানেই শত্রুতা নয়—এটা অনুধাবনের সময় কি এখনো আসেনি? একজন কর্মী যদি শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার হন, তবে তা শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই অশনিসংকেত।
ঈদ আমাদের শেখায় ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ক্ষমার মহৎ শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তবে উৎসবের তাৎপর্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যদি ঈদের দিনেও কেউ ভয়ে পালিয়ে বেড়ান, কোনো মা সন্তানের জন্য অশ্রু ঝরান, কোনো পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটায়—তবে সেই ঈদের আনন্দ আর কতটা পূর্ণ থাকে?
এই বাস্তবতা শুধু একটি দলের নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। আজ যারা ভুক্তভোগী, কাল তারা ক্ষমতায় গেলে একই চক্র আবার ঘুরতে শুরু করে। ফলে ভোগান্তি কমে না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আজ সময়ের দাবি। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সর্বোপরি একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে ঈদ সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য আনন্দের উৎসবে পরিণত হবে।
তবুও আশার আলো নিভে যায়নি। ইতিহাস সাক্ষী—বাংলাদেশের মানুষ প্রতিকূলতা জয় করতে জানে। তারা বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আবারও দাঁড়াবে। হয়তো একদিন আসবে, যখন রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবে—কোনো ভয় বা শঙ্কা ছাড়াই।
সেই প্রত্যাশাতেই বলা যায়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানবিকতা চিরস্থায়ী। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই এই বেদনার ঈদ একদিন সত্যিকারের আনন্দের ঈদে রূপ নেবে।
নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক।