আগুনের রাজনীতি: নির্বাচনের আগমুহূর্তে পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতার নীলনকশা?
নয়ন বিশ্বাস রকি:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে “আগুন” এখন আর কেবল দুর্ঘটনার প্রতীক নয়—এটি এক প্রকার অস্ত্র। ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হটানোর কৌশলে এখন আগুনই হয়ে উঠছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উপাদান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে “আগুনের মহাউৎসব” শুরু হয়েছিল, তা ২০২৫ সালেও নতুন রূপে ফিরে এসেছে। উদ্দেশ্য একটাই—দেশে ভয়, বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থাপনায় যে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠেছিল, তা আজও মানুষ ভুলতে পারেনি। মেট্রোরেল স্টেশন, সেতু ভবন, বিটিভি ভবন, যশোর হোটেল, গাজী টায়ার কারখানা—সবখানেই আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। পরে আগুন লাগে সচিবালয়েও। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, এগুলো ছিল meticulously designed operations, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করে বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠীর হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই, বলে বিশ্লেষকদের অনেকে, শুরু হয়েছিল NDA (National Development Agreement)–এর নামে বিদেশি প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। তখন থেকেই দেশের ভেতরে ও বাইরে চলতে থাকে রাজনৈতিক গোপন দরকষাকষি, যাকে অনেকেই অভিহিত করেছেন “ইজারার রাজনীতি” হিসেবে।
২০২৫ সালেও সেই আগুনের খেলা যেন নতুন করে জ্বলে উঠেছে। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে আবারও স্তব্ধ হয়ে পড়েছে দেশ।চট্টগ্রামে পোশাক কারখানায় আগুন,মিরপুরের শিল্পাঞ্চলে আগুন,হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগুন,চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আগুন ,নারায়ণগঞ্জে মেঘনা চিনি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড,ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানায় আগুন ।
এই ঘটনাগুলোর অনেকগুলোরই সময়কাল ও প্রেক্ষাপট একই—নির্বাচনের পূর্ববর্তী মাসগুলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একই সময়ে আগুন লাগা কেবল কাকতালীয় হতে পারে না। এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে নির্বাচন ঠেকানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলে এখন একটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলোচিত—নির্বাচন হলে মহাজনের অবস্থান দুর্বল হবে, তাই নির্বাচন বানচাল করাই এখন তাদের বাঁচার কৌশল। NDA’র অধীনে যে সব চুক্তি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন বা প্রক্রিয়াধীন, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য দরকার সময়—আর সময় পেতে হলে ক্ষমতায় থাকতে হবে দীর্ঘমেয়াদে। তাই আগুন, ভয়, নাশকতা—সবই এক অশুভ উদ্দেশ্যের বাহক।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনকার প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পেছনে একই ধরনের নকশা দেখা যাচ্ছে—প্রথমে অর্থনৈতিক স্থাপনা টার্গেট করা, পরে শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান, তারপর সরকারি অবকাঠামোতে আগুন। এর মাধ্যমে সরকারকে “ব্যর্থ রাষ্ট্র” প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক মহলে চাপ সৃষ্টি করা এবং নির্বাচনকে অনিশ্চিত করা—এটাই মূল বাংলাদেশের জনগণ এখন প্রশ্ন করছে—
এই আগুনের উৎস কোথায়? কাদের স্বার্থে এই খেলা?
যখন একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন লাগে, তখন সাধারণ মানুষ জানে—কেবল শ্রমিকের অসাবধানতা বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে এতটা ধ্বংস সম্ভব নয়। এই আগুনের পেছনে অদৃশ্য হাত রয়েছে, যারা আগুনের ছাইয়ে ভবিষ্যতের রাজনীতি সাজাতে চায়।
আজকের আগুন কেবল কারখানায় নয়—এটি জ্বলছে দেশের রাজনীতির অন্তরে।
নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই অগ্নিকাণ্ডগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতার অংশ।
যারা ভাবছে আগুন দিয়ে তারা পথ তৈরি করবে, তারা ভুলে যাচ্ছে—
আগুন কখনো দিক চেনে না।
আজ যার হাতে আগুন, কাল সেই আগুনেই পুড়ে ছাই হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু সহ্য করেছে, কিন্তু দেশ বিক্রি বা অরাজকতার আগুনে ভবিষ্যৎ পোড়াতে দেবে না।
মহাজনের পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে অনেক আগেই—
এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, কখন সেই আগুনে গর্ত তৈরি হয়, আর কে তাতে পড়ে।
নয়ন বিশ্বাস রকি
সাবেক ছাত্র নেতা ।



















