৭ নভেম্বর ১৯৭৫: বাঙালির ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায় ও ‘মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস’
হুমায়ূন কবীর ঢালী:
৭ নভেম্বর, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক রক্তিম, মর্মান্তিক ও চরম বিতর্কিত অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তথাকথিত ‘বিপ্লব’ ও ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’-এর আড়ালে একদল সেনাসদস্য এবং রাজনৈতিক কুচক্রী নির্মমভাবে হত্যা করে দেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। এই কলঙ্কজনক দিনে প্রাণ হারান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম, কর্নেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম এবং লে. কর্নেল এটিএম হায়দার বীর উত্তমসহ অসংখ্য দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিক। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তার গড়া রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং ৭১-এর যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এই দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে উদযাপন করতে শুরু করে। কিন্তু ইতিহাসের গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, দিনটি মূলত ‘মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস’ বা ‘জাতীয় প্রতারণা দিবস’। ইতিহাসের সত্য ঘেঁটে পাওয়া যায়, না ছিল এতে প্রকৃত কোনো বিপ্লব, না ছিল কোনো জনসংহতি—বরঞ্চ এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় রচিত এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধ্বংস করে দেশকে নয়া পাকিস্তানে রূপান্তরের সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান।
১৯৭২ সাল থেকে তৎকালীন রাজনীতিতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের নামে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে জাসদ ও তাদের অঙ্গসংগঠন ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’ ও ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সশস্ত্র বাহিনীতে তাদের বিস্তার ঘটাতে থাকে। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, বামপন্থী দলগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের তাড়না সেনাবাহিনীর ভেতরেও এক গভীর বিভাজনের সৃষ্টি করেছিল। অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর স্থলে উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর অপসারণকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে স্বাগত জানায় এবং চীন ও সৌদি আরব বাংলাদেশের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ তার বিভিন্ন গবেষণায় ও লেখায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তীতে ৭ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ঘটনাগুলো ছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি গভীর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও তাঁর বিভিন্ন কলামে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও নিরাপদ করতে এবং একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসন করতে ৭ নভেম্বরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
খন্দকার মোশতাকের অবৈধ সরকারের ছত্রছায়ায় ১৫ আগস্টের খুনি মেজর-কর্নেলরা বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়ে সামরিক বাহিনীর স্বাভাবিক ‘চেইন অব কমান্ড’ পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। সেসময় চিফ অফ জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চেইন অব কমান্ড পুনঃস্থাপনের জন্য সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বারংবার তাগিদ দেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অক্ষমতা ও অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে অরাজকতা দূর করা, চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা এবং ১৫ আগস্টের খুনিদের সেনানিবাসে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্যে ৩ নভেম্বর ভোররাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ, ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার শাফায়াত জামিল ও ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিরোধমূলক রক্তপাতহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। কিন্তু এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়েই ৩ নভেম্বর প্রথম প্রহরে মোশতাক ও তার সহযোগী খুনিচক্রের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে। ওসমানীর মধ্যস্থতায় ১৫ আগস্টের খুনিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের অন্যতম খুনি মেজর মহিউদ্দীনসহ কয়েকজন সেনানিবাসেই রয়ে যায়। তারা এবং ভারত-বিরোধী ও পাকি-ধারার শক্তিগুলো সেনানিবাসগুলোতে গুজব ছড়াতে থাকে যে খালেদ মোশাররফ একজন ‘ভারতের দালাল’ এবং তিনি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টায় (৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে) সুবেদার মেজর আনিসুল হকের ইঙ্গিতে ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহী বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং ২-ফিল্ড রেজিমেন্টের সৈনিকরা অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র ছিনতাই করে এবং উন্মত্তের মতো স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে আসে। মেজর মহিউদ্দীন ও সুবেদার মেজর আনিসের নেতৃত্বে টু-ফিল্ডের একদল সৈন্য জিয়াউর রহমানের বাসভবনের গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। জিয়াকে পাহারারত ফার্স্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা শূন্যে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে যায়। সৈন্যরা জিয়াকে মুক্ত করতে চাইলে প্রথমে তিনি অনিচ্ছা ও ভয় প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীতে তাদের সাথে হেঁটে টু-ফিল্ড রেজিমেন্টে যান। এদিকে, জাসদ নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের বীর উত্তম মনে করেছিলেন তিনি জিয়ার মাধ্যমে তার বিপ্লবী এজেন্ডা ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন। রাত প্রায় ২টা ৩০ মিনিটে তাহের টু-ফিল্ডে পৌঁছে জিয়ার সাথে একান্তে বহুক্ষণ কথা বলেন। কিন্তু চতুর জিয়াউর রহমান খুব দ্রুতই অনুধাবন করেন যে তাহেরের সাথে গেলে তিনি রাজনৈতিক ও সামরিক জটিলতায় জড়িয়ে পড়বেন। ফলে তিনি তাহেরের সাথে রেডিও স্টেশনে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং সুবেদার মেজর আনিসকে কানে কানে বলেন—“ওকে কোনোভাবে সরিয়ে দিন এখান থেকে। সাবধান, বহু পলিটিক্স আছে।” পরবর্তীতে টু-ফিল্ডের কার্যালয়েই জিয়ার সংক্ষিপ্ত রেডিও ভাষণ রেকর্ড করা হয়, যেখানে তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন।
৭ নভেম্বরের মধ্যরাতে সেনানিবাসের ভেতরের পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করে। রাতভর চলে কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ওপর নৃশংস অত্যাচার। রাত ১২টার পর উত্তেজিত সেনাসদস্যরা সেনা কর্মকর্তাদের বাসভবনে হামলা চালায়। প্রথম আক্রমণেই একজন নারী চিকিৎসকসহ একাধিক অফিসারকে হত্যা করা হয়। এমনকি সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীর অসুস্থ স্ত্রীকেও গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ হকি টিমের ক্যাম্পে থাকা তরুণ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও লে. মোস্তাফিজকেও তাড়া করে নিয়ে গিয়ে টিভি স্টেশনের সামনে হত্যা করা হয়। ৭ নভেম্বর ভোররাতে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এটিএম হায়দার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে পৌঁছান। কিন্তু তৎকালীন ১০ম বেঙ্গলের অধিনায়ক কর্নেল নওয়াজিস ফোন করে টু-ফিল্ডে সদ্যমুক্ত জিয়াউর রহমান ও মেজর জলিলকে খালেদ মোশাররফের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন। ভোর হওয়ার সাথে সাথে সিপাহী বিদ্রোহের ঢেউ ১০ম বেঙ্গলেও এসে পড়ে। অফিসার মেসে বসে যখন তারা সকালে নাস্তা করছিলেন, তখন মেজর জলিল ও এক বিপ্লবী হাবিলদার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র উঁচিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে চিৎকার করে বলে—"আমরা তোমার বিচার চাই!" খালেদ মোশাররফ ধীর ও শান্ত কণ্ঠে বলেন—"ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।" হাবিলদার চিৎকার করে উঠে বলে—"আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো!" খালেদ দু'হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢাকলেন। তখনই ব্রাশফায়ারের নির্মম শব্দে ঝাঁঝরা হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের ২নং সেক্টরের কমান্ডার ও কে-ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা, বীর উত্তম খালেদ মোশাররফের বুক—যার মাথায় তখনও ছিল মুক্তিযুদ্ধের কামানের গোলার গভীর ক্ষতচিহ্ন। একই সাথে ব্রাশফায়ারে প্রাণ হারান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ও ৮নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার বীর বিক্রম কর্নেল নাজমুল হুদা। ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বীর উত্তম লে. কর্নেল এটিএম হায়দারকে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে লাথি, কিল-ঘুষি মারতে মারতে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও বাংলাদেশের কোনো সেক্টর কমান্ডারকে প্রাণ হারাতে হয়নি, কিন্তু ৭ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ষড়যন্ত্রে একদিনেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন দুজন সেক্টর কমান্ডার ও একজন সাব-সেক্টর কমান্ডার। এছাড়া সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ১৩ জন অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় বঙ্গভবনে যেভাবে পাকি-পন্থী স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমনি ৭ নভেম্বর সেনানিবাস ও ঢাকার রাস্তায় সৈন্যরা চিৎকার করে ‘নারা-ই-তাকবির’ এবং ‘সিপাহী-জনতা জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেয়। ৭ নভেম্বর সিপাহীদের চেহারা ও আচরণ নিয়ে কর্নেল শাফায়াত জামিল তার ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নেওয়া সিপাহীরা ছিল পাকিস্তান প্রত্যাগত এবং তারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যাটালিয়নে ছিল না। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ষড়যন্ত্র এবং জঘন্য হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার জন্যই বিশেষ মহল ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং বিশেষ মহলের নেপথ্যে কারা ছিল তা জাতির নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোনো ব্যাটালিয়নই এই নাশকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। মূলত পাকিস্তানফেরত সেনাদের ব্যবহার করেই মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারাকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। ইতিহাসের বরেণ্য গবেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন ও ইতিহাসবিদ ড. আনোয়ার হোসেনও তাঁদের বিভিন্ন লেখনীতে এই সত্য তুলে ধরেছেন যে, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ সিপাহী অসন্তোষ ছিল না; এটি ছিল মূলত পাকিস্তানমুখী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির একটি সুদূরপ্রসারী সশস্ত্র চক্রান্ত, যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সামরিক নেতৃত্বকে চিরতরে নিঃশেষ করা হয়েছিল।
জিয়াউর রহমান ও তার সমর্থকদের গড়া ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ ধারণার পেছনে সত্যতার কোনো ভিত্তি নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তৎকালীন বেশ কিছু জ্বলজ্বলে বাস্তবতা সামনে আসে। প্রথমত, ৭ নভেম্বরের পুরো ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা সেনানিবাসের প্রাচীরের ভেতরে। ঢাকার রাস্তায় বা সারা দেশের কোথাও সাধারণ মানুষের এই ঘটনায় কোনো স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বা ভূমিকা ছিল না। সাধারণ মানুষ এই সেনা অভ্যুত্থান বা রক্তপাতের বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানত না। কোনো গণবিপ্লবের পটভূমি গণমানুষ ছাড়া রচিত হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আতিকুল আলম ও এনায়েতুল্লাহ খানের মতো কতিপয় সাংবাদিক এবং পাকিস্তানফেরত চক্র প্রচার করেছিল যে খালেদ মোশাররফ ভারতের সহায়তায় সরকার উৎখাত করতে চেয়েছেন। পরবর্তীতে ঢাবির সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দিন আহমেদসহ বহু গবেষক লিখেছেন যে, খালেদ মোশাররফ ছিলেন একজন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক এবং ভারতের সাথে তার কোনো গোপন যোগসাজশ ছিল না। তৃতীয়ত, কর্নেল তাহের ও জাসদের গণবাহিনী জিয়াকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করলেও, জিয়া ক্ষমতায় শক্ত আসন গাড়তেই তাহেরসহ জাসদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের আমলে ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে এক প্রহসনের ট্রাইব্যুনালে (ক্যাঙ্গারু কোর্ট) সামরিক বিচার দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়। চতুর্থত, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসীন হওয়া জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে একের পর এক সেনা বিদ্রোহ দমন ও ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করার নামে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সামরিক আদালতে প্রহসনের বিচার চালিয়ে কয়েক হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাসদস্যকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুম করে হত্যা করেন।
সংগত কারণেই বলা যায়, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কোনো সংহতি বা বিপ্লবের দিন ছিল না; এটি ছিল এক নির্মম ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’। ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করতে এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসন করতেই দিনটিকে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ নামে এক বিভ্রান্তিকর মোড়কে সাজানো হয়েছিল। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের পরিধি বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করা, সংবিধানের মূল চার নীতি ক্ষতবিক্ষত করা এবং পরবর্তীতে শাহ আজিজুর রহমানের মতো চিহ্নিত রাজাকারদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়—৭ নভেম্বরের মূল উদ্দেশ্য ছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান ঘটানো। ৭ই নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে উদযাপনের কোনো দিন নয়, বরং এটি একটি গভীর শোক, লজ্জা ও আত্মউপলব্ধির দিন। জাতিকে এই অন্ধকার ইতিহাসের সঠিক রূপ উপলব্ধি করতে হবে এবং শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাঝে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।



















