Logo

আন্তর্জাতিক    >>   মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার আশঙ্কা, উদ্বেগে মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার আশঙ্কা, উদ্বেগে মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার আশঙ্কা, উদ্বেগে মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়াতে পারে ওয়াশিংটন—এমন আশঙ্কায় উদ্বেগ বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তিনি জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। তবে নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেননি। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বাসিন্দারা সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় ভ্রমণ, সন্তানদের স্কুল এবং কর্মস্থল নিয়ে আগাম পরিকল্পনা করছেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যে বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধের অষ্টম মাসে এসে দুই পক্ষই কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। সামরিকভাবেও কোনো পক্ষ চূড়ান্ত সুবিধা আদায় করতে পারেনি।

ট্রাম্প কখনো ইরানে নতুন করে হামলার হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছেন। চলতি মাসের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই ইরানে হামলা চালাবে না। তবে নির্বাচনের পর হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেননি তিনি।

গত শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। রোববার এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প শুধু বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে।

নতুন অস্ত্রের হুমকি দিচ্ছে ইরান

অন্যদিকে ইরানও নতুন করে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, আগের তুলনায় আরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের মজুত তৈরি করেছে তেহরান।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ইরান শুধু তেল স্থাপনায় হামলা চালাবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সম্ভাব্য নতুন সংঘাতকে তিনি দীর্ঘ ‘চমকের যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নতুন কোনো হুমকি এলে ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই’ জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযানের বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানে নতুন হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাড়ছে উদ্বেগ

সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকেরা। সৌদি আরবে বসবাসকারী ৩৬ বছর বয়সী এক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সিএনএনকে বলেন, মানুষের মনোভাব বদলে গেছে। সবাই এখন অনেক বেশি সতর্ক। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। ওই নারী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই সৌদি আরব ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।

সৌদি আরবের কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বড় আয়োজন বাতিল করা হয়েছে। কিছু অফিস বন্ধ রেখে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও দূরশিক্ষণ কার্যক্রমও চালু রয়েছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ছুটির মৌসুমে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে মে মাসের পর থেকে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। তারপরও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি তেল কোম্পানি একটি বড় তেল সম্মেলনে তাদের নির্বাহীদের পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

অন্যদিকে বাহরাইনের বাসিন্দাদের মধ্যে আগের যুদ্ধের মানসিক প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ২১ বছর বয়সী এক বাসিন্দা সিএনএনকে বলেন, বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে এখনো আতঙ্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে বাইরে বিস্ফোরণের শব্দ হলে রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের পরিবার সরছে

যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রতি কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পরিবারের সদস্য নীরবে অঞ্চল ছাড়তে শুরু করেছেন। স্কুলে তাঁদের সন্তানেরা সহপাঠীদের বিদায় জানানোর পর বিষয়টি সামনে আসে।

এর আগে মার্চে যুদ্ধের সময় নিরাপত্তার কারণে এসব পরিবারের অনেক সদস্যকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁরা আবার কর্মস্থলে ফিরে এসেছিলেন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার অতিরিক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেনা পাঠানোর খবরও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

যুদ্ধ এড়াতে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা

যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইরানের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি পর্যালোচনা করছে তেহরান।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পক্ষ থেকে চিকিৎসাসামগ্রী চাওয়ার বিষয়ে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এ নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এদিকে কাতারে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন দেশটির এক কর্মকর্তা। তবে শনিবারের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া-ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক মনে করেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।

তিনি বলেন, দুই পক্ষ এমন একটি অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যেখানে সাময়িকভাবে সংঘাত বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এর জন্য পারস্পরিক আস্থা জরুরি।

আলোচনায় শর্ত দিচ্ছে দুই পক্ষই

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে আগ্রহী। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, কোনো সমাধানই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারবে না। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের সমাধান করতে হবে।

অন্যদিকে ইরানও আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের আস্থা নেই। ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এর আগেও আলোচনার মধ্যেই দেশটির ওপর সামরিক হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়া হলেই কেবল আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এবং কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা—দুই পরিস্থিতিই পাশাপাশি এগোচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে অঞ্চলটির আগামী দিনের পরিস্থিতি। সূত্র: সিএনএন, জাগোনিউজ