সৌদি আরব কি আর নিরাপদ নয়? হামলার আতঙ্কে প্রবাসী পরিবার!
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও স্থিতিশীল দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার পর দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে পরিবারকে নিজ দেশে পাঠানোর কথাও ভাবছেন কেউ কেউ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলার প্রভাব পড়ছে দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েও।
বিমানবন্দরে হামলার পর আতঙ্ক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল-ইখবারিয়ায় প্রচারিত নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি করছেন। বিমানবন্দরের একটি অপেক্ষাকক্ষে ধুলা ছড়িয়ে পড়া এবং ছাদের কিছু অংশ ভেঙে মেঝেতে পড়ার দৃশ্যও দেখা যায়। প্রতিবেদনে বিমানবন্দরে হামলায় হতাহতদের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা প্রকাশের আগে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘পরিস্থিতি খারাপ হলে পরিবারকে দেশে পাঠানোর কথা ভাবব’
সাত বছরের বেশি সময় ধরে রিয়াদে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল বলেন, ধর্মীয় সফরে যাওয়া মানুষকে প্রাণহানির আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের ওপর হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সৌদি আরবে ভালো বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন থাকায় দেশ ছেড়ে যাওয়া তাঁর জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয়। তবে হামলা বাড়তে থাকলে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিলাল বলেন, যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা তাঁর নেই। তিনি ও তাঁর পরিবার সৌদি আরবে জীবন গড়ে তুলেছেন। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং হামলা ঘন ঘন ঘটতে থাকলে পরিবারকে দেশে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন। সৌদি আরবে বিভিন্ন সময়ে বসবাস করা আরেক ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর সন্তানরা সাম্প্রতিক ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির দেশে ফেরার পরিকল্পনার খবর পরিস্থিতি বোঝানো কঠিন করে তুলেছে বলে জানান তিনি। মোহাম্মদের ভাষায়, রিয়াদকে আর আগের মতো নিরাপদ মনে হচ্ছে না।
সৌদির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা
হুথিদের হামলা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পর্যটন ও বিনোদন খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেশটিকে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে সৌদি সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদে অনুষ্ঠিত একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনে প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রতিনিধি অংশ নেন। দুই সপ্তাহ পর দেশটিতে ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আয়োজন হওয়ার কথা। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সৌদি আরব কতটা স্থিতিশীল পরিবেশ তুলে ধরতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব ও হুথিদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট গভীর হওয়ার পর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে। এতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এর জবাবে ২০১৫ সালের মার্চে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাতে দেশটিতে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। ক্ষুধা, রোগব্যাধি, স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও সরাসরি সহিংসতাসহ নানা কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটিকে বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আঞ্চলিক সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।
হরমুজ ও লোহিত সাগর ঘিরে বাড়তি ঝুঁকি
ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব লোহিত সাগরকে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে হুথিদের পক্ষ থেকে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার খবর সেই বিকল্প পথ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সানা বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার পর হুথিরা পাল্টা অবরোধের হুমকি দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকার আকাশসীমা ও পরিবহনব্যবহারে বাধার জবাবেই তারা সৌদি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে এসব বক্তব্য হুথিদের নিজস্ব দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব নিয়েও বিতর্ক সামনে এনেছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো ও সামরিক প্রবেশাধিকারের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি কিনেছে।
এর বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত বাড়ার পর মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপসাগরীয় বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগের পরিবর্তে যুদ্ধের পথে যাওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই সংঘাত আঞ্চলিক মিত্রদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছে, যে যুদ্ধ তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।
রিয়াদে হামলার পর ট্রাম্পের মন্তব্য—সৌদি আরব নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম—নিয়েও ওই বিশ্লেষক হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বলা হলেও সংকটের সময় দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলে অংশীদারত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এ অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চুক্তিটির লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা। তবে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সম্ভাব্য সময় ও পরিসর সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবন, প্রবাসী পরিবারের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কেও। সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট আই, জাগোনিউজ



















