মধ্য এশিয়ায় নতুন ভূরাজনীতি: চীন-রাশিয়াকে টেক্কা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা, রুবিওর সফরে শতাধিক কোম্পানির প্রতিনিধি
মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে অক্টোবরের মাঝামাঝি উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর সমরকন্দ সফর করার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। সেখানে ‘সি৫+১’ (C5+1) সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলও সফরে যাবে। মধ্য এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে মার্কিন ব্যবসায়িক উপস্থিতি সম্প্রসারণই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে অঞ্চলটির অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনের কাছে এ উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। চীন ও রাশিয়ার প্রভাবের পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সক্রিয় উপস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও এ অঞ্চলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।
সি৫+১ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সি৫+১ হলো মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশ—কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান—এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতার একটি ফোরাম। এর লক্ষ্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। কাজাখস্তান অঞ্চলটির আয়তনে বৃহত্তম দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের অধিকারী। কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও জলসম্পদের জন্য পরিচিত। তুর্কমেনিস্তানে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুত। অন্যদিকে, উজবেকিস্তান আঞ্চলিক বাণিজ্য, উৎপাদন ও পরিবহন যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই পাঁচ দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করাই সি৫+১ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ওয়াশিংটনের কাছে এর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।
ওয়াশিংটন-তাশখন্দ সম্পর্ক জোরদারে ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা
সমরকন্দে সি৫+১ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দুই দেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে আগ্রহী। এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো, আগামী ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানকে আমন্ত্রণ জানানো।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ এবং কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভকে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির বিখ্যাত উইলার্ড ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে উজবেকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনার আয়োজন করে দেশটির যুক্তরাষ্ট্রস্থ দূতাবাস। সেখানে বক্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উজবেকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব দেন। ট্রাম্পের এমন সফর বাস্তবায়িত হলে তা মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির চেয়ারম্যান জেসন স্মিথ সম্প্রতি একটি কংগ্রেসীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও মঙ্গোলিয়া সফর করেছেন। সফরের পর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত অংশীদারত্বের সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের একটি কমিটিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সি৫’-এর প্রেসিডেন্ট সাপারগলি শালগিমবায়েভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে যারা কাজ করছেন, তাঁদের জন্য কংগ্রেসে এত উচ্চপর্যায়ে এসব বিষয়ে আলোচনা হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গরও সম্প্রতি তাশখন্দে উজবেক প্রেসিডেন্ট মিরজিয়োয়েভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উজবেকিস্তানের পক্ষ থেকেও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
উজবেক প্রেসিডেন্টের প্রশাসনপ্রধান এবং তাঁর মেয়ে সাইদা মিরজিয়োয়েভা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে তাঁর একটি টেলিগ্রাম পোস্টে জানানো হয়। তবে বৈঠকটি সম্পর্কে দুই দেশের সরকারই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে কূটনৈতিক উপস্থিতিও বাড়াচ্ছে উজবেকিস্তান। ওয়াশিংটনে দূতাবাস ও নিউইয়র্কে কনস্যুলেট থাকার পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের শুরুতে সিয়াটলে নতুন কনস্যুলেট জেনারেল চালু করেছে দেশটি। দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বাড়ছে সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক চুক্তি, উড়োজাহাজ কেনা এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত জুনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার তাশখন্দ সফর করেন। এ সময় দুই দেশের বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন অঙ্গীকারসংবলিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে উজবেকিস্তান সর্বোচ্চ ২২টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৮৫০ কোটি ডলারের একটি চুক্তির ঘোষণা দেয়। দেশটির বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন খাত আধুনিকায়নই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
নতুন উড়োজাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সরাসরি দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে যাত্রী পরিবহন, পর্যটন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে বিনিয়োগের প্রবাহ শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে মধ্য এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। উজবেকিস্তানের প্রতিষ্ঠান এএফকেএ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের বোলিং গ্রিন শহরে একটি উৎপাদন কারখানা নির্মাণ করছে। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো উজবেক প্রতিষ্ঠানের প্রথম উৎপাদন কারখানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা রয়েছে।
এ উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন দিক তুলে ধরছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেই আগ্রহী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও নিজেদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে।
তবে সমরকন্দে আসন্ন সম্মেলন ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কতটা নতুন বিনিয়োগ বা বাণিজ্যিক চুক্তি আসবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কূটনৈতিক বৈঠক ও ব্যবসায়িক আলোচনার পর চুক্তি চূড়ান্ত করতে সময়, দর-কষাকষি এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় রয়েছে চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের সহযোগিতার সব ক্ষেত্রে সমান অগ্রগতি হয়নি।
২০১২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি ন্যাশনাল গার্ড উজবেক সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে আসছে। তবে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার কারণে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন সামরিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতেও যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের সামনে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে চীনের উদ্যোগে গঠিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন’ (ডব্লিউএআইসিও)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য উজবেকিস্তান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়াতে ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলেছে। এ প্রেক্ষাপটে একই দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উভয় উদ্যোগে অংশ নিলে কৌশলগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কাজাখস্তান বর্তমানে ডব্লিউএআইসিও ও প্যাক্স সিলিকা—উভয় উদ্যোগের সদস্য। এ পরিস্থিতিতে দেশটিকে একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
উজবেকিস্তানও ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। তবে চীনের উদ্যোগে গঠিত প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কাঠামোয় দেশটির অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়তে প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের সম্পর্কের অগ্রগতির ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—সি৫+১ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সফর এবং জি-২০ সম্মেলনে উজবেক প্রেসিডেন্ট মিরজিয়োয়েভের অংশগ্রহণ। এসব উদ্যোগ সফল হলে ওয়াশিংটন-তাশখন্দ সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার বৃহত্তর অংশীদারত্বেও ইতিবাচক গতি তৈরি হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনকে একসঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো বিষয় দেশটির পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের জন্য একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘জ্যাকসন-ভ্যানিক সংশোধনী’ প্রত্যাহার করা। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সীমিত বলে প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বোয়িংয়ের নতুন উড়োজাহাজের মাধ্যমে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু করা গেলে পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের বাইরে অন্যান্য শিল্প, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
মধ্য এশিয়ায় বাড়ছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আজারবাইজানের মতো দেশও অঞ্চলটির সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে।
আজারবাইজান ও উজবেকিস্তানের মধ্যে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের উদ্যোগও এ প্রতিযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের আগে মধ্য এশিয়ায় আরব দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছিল। তবে সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের কারণে এসব বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় আগ্রহী থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়, বাস্তব বিনিয়োগ ও কার্যকর সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সফরের সাফল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপে
সমরকন্দে সি৫+১ সম্মেলন এবং শতাধিক মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সম্মেলনের তাৎপর্য শুধু বৈঠক, ঘোষণা কিংবা কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প কতটা বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
উজবেকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী হলেও অঞ্চলটিতে অন্যান্য শক্তির সক্রিয় উপস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য প্রতিযোগিতাকে জটিল করে তুলছে। তাই মধ্য এশিয়ায় অংশীদারত্ব জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধারাবাহিক ও বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, মার্কো রুবিওর আসন্ন সফর এবং শতাধিক মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ওয়াশিংটন ও তাশখন্দের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব নির্ধারিত হবে সম্মেলন-পরবর্তী বাস্তব অগ্রগতি এবং প্রতিশ্রুতিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। সূত্র: জাগোনিউজ



















