ফরহাদ মজহারের ডিগবাজি এবং জুলাই আন্দোলনের নতুন গল্প
প্রফেসর চন্দন সরকার:
ফরহাদ মজহারকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। ড. আবুল বারকাত স্যারের সঙ্গে কাজের সূত্রে দারিদ্র্য বিমোচনবিষয়ক কয়েকটি কর্মশালায় তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার সেই অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না। আমার দু-একটি কথায় তিনি বিরক্তও হয়েছিলেন। ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগও আর তেমন হয়নি।
গত জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় অনেক হিন্দু নেতা যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন, তখনও আমার মনে হয়নি যে তাঁর সঙ্গে দেখা করা আমার জন্য জরুরি। তাই যাইনি। তবে তাঁর স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনকে দীর্ঘদিন ড. আবুল বারকাত স্যারের এইচডিআরসিতে বসে থাকতে দেখেছি—স্যারের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায়। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে তাঁকে বরাবরই অত্যন্ত সরল-সাদাসিধে মানুষ বলেই মনে হয়েছে। পরবর্তীতে নানা প্রক্রিয়ায় তিনি উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন—এটিও এখন আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
কিন্তু ফরহাদ মজহারকে নিয়ে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
রাজনীতির মঞ্চে তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের ইতিহাস নতুন নয়। তিনি কখন কোথায় দাঁড়ান, কোন বক্তব্যের পর কোন বক্তব্য দেন—এসব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা আছে। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যও নিছক আরেকটি বক্তব্য হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিভিন্ন দূতাবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে তাঁদের ‘মগজধোলাই’ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব সেফ হাউসে তাঁদের এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়েছিল, যাতে তাঁরা শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসকেও জড়িত করেছেন।
এখানেই বড় প্রশ্ন।
যদি তাঁর বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অর্থ দাঁড়ায়—একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ষড়যন্ত্র ছিল এবং আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রভাবিত করা হয়েছিল।
কিন্তু এমন গুরুতর অভিযোগের ভিত্তি কী?
প্রমাণ কোথায়?
কোন দূতাবাসে, কখন, কারা আশ্রয় পেয়েছিলেন? কারা তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন? কীভাবে ‘মগজধোলাই’ করা হয়েছিল? এর পেছনে কারা ছিলেন? কোনো নথি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য কিংবা যাচাইযোগ্য তথ্য কি তাঁর কাছে আছে?
নাকি এটি কেবল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ?
কারণ অভিযোগটি করছেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁকে জুলাই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে অনেকে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য তাই সাধারণ কোনো পথচারীর মন্তব্যের মতো উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি চাইলে ভারতের কথা বলতে পারতেন—তাহলে হয়তো রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ এটিকে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক বক্তব্য বলে পাশ কাটিয়ে যেত। আওয়ামী লীগের কেউ বললে আন্দোলনকারীরা সেটিকে রাজনৈতিক অপপ্রচার বলেও এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু যখন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র ফরহাদ মজহার নিজেই এমন প্রশ্ন তুলছেন, তখন বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরেকটি বক্তব্যও ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘যতদিন জামায়াতে ইসলামী থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগ থাকবে।’
এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে বক্তব্যটিকে অগ্রহণযোগ্য, বিভ্রান্তিকর, অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলা হয়েছে।
এখানেও প্রশ্ন উঠতে পারে—ফরহাদ মজহারের রাজনৈতিক দর্শনের অবস্থান আসলে কোথায়?
তিনি কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বলছেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে বলছেন, নাকি বাংলাদেশের প্রচলিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে গিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের কথা বলছেন?
নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও বদলে যাচ্ছে?
রাজনীতিতে মত পরিবর্তন অপরাধ নয়। একজন মানুষ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করতেই পারেন। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি একটি আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকেন, আন্দোলনের রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণে ভূমিকা রাখেন এবং পরে সেই আন্দোলনের উৎপত্তি ও পরিচালনা নিয়ে ভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা হাজির করেন, তখন তাঁর বক্তব্যের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস এখনো পুরোপুরি লেখা হয়নি। বরং ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নিয়ে বিতর্কই চলছে। কারা আন্দোলন সংগঠিত করেছিল, কারা অর্থ ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল, বিদেশি শক্তির ভূমিকা কী ছিল, কোন পর্যায়ে আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গবেষণায় আরও স্পষ্ট হবে।
তাই কাউকে ‘জুলাইয়ের বাবা’, ‘দাদু’ কিংবা ‘মাস্টারমাইন্ড’ বানিয়ে ইতিহাস লিখে ফেলা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি কাউকে হঠাৎ করে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করাও দায়িত্বশীল কাজ নয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচারক হলো তথ্য।
ফরহাদ মজহারের বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে প্রমাণ সামনে আসা উচিত। আর যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে এমন গুরুতর অভিযোগ কেন করা হলো—সেটিও তাঁকেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের নামে দেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে ‘মবের রাজনীতি’, মতপ্রকাশের ওপর চাপ, ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং ইতিহাসকে নিজের সুবিধামতো পুনর্লিখনের প্রবণতা—এসবই ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
আজ একজনের বক্তব্যে উল্লাস করা হবে, কাল সেই বক্তব্যই অন্য কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ফিরে আসতে পারে।
তাই ব্যক্তি নয়—প্রশ্ন হোক বক্তব্যের।
আবেগ নয়—প্রমাণ হোক রাজনীতির ভিত্তি।
আর জুলাইয়ের ইতিহাস যদি সত্যিই জনগণের ইতিহাস হয়, তাহলে সেই ইতিহাসে কারও একক মালিকানা থাকতে পারে না।
ফরহাদ মজহারের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই শুধু তাঁর ‘ডিগবাজি’ নিয়ে হাসি-ঠাট্টার বিষয় নয়; বরং এটি জুলাই আন্দোলনের অন্তর্নিহিত রাজনীতি, বিদেশি ভূমিকা এবং ক্ষমতার পালাবদলের নেপথ্যকাহিনি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
জুলাইয়ের গল্প আসলে কার লেখা?
আর সেই গল্পের কতটুকু ইতিহাস, কতটুকু রাজনীতি—আর কতটুকুই বা সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া বয়ান?
প্রফেসর চন্দন সরকার,
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মী



















