ইমরান খানের সঙ্গে যোগাযোগ ‘বিচ্ছিন্ন’: দুই ছেলের উদ্বেগ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান। তাদের দাবি, গত সাত মাস ধরে তাদের বাবা, তার চিকিৎসক, পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের কেউই ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে কারাগারে তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যও তাদের কাছে নেই।
কাসিম ও সুলাইমান ইসা খান বলেছেন, ‘আমাদের কাছে কোনো আপডেট নেই। কারণ গত সাত মাস ধরে তার পরিবার, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।’
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতাকর্মীরা। এসব কর্মসূচি থেকে ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।
লন্ডন থেকে বাবার মুক্তির দাবি
ইমরানের দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছেন। ২০০৪ সালে ইমরান খানের সঙ্গে তাদের মা জেমিমা গোল্ডস্মিথের বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে তারা লন্ডনেই থাকেন।
বাবা কারাবন্দি হওয়ার পর থেকেই তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার তারা। তাদের অভিযোগ, গণমাধ্যমে ইমরানকে নিয়ে কথা বলার পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা তৈরি করা হয়েছে। কখনো ভিসা নিয়ে জটিলতা, আবার কখনো প্রশাসনিক সমস্যার কারণে তারা পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি বলে দাবি করেন তারা।
কাসিম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, আমরা যেতে চাই। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। আমাদের ভিসা না দেওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় তাদের এই অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, কাসিম ও সুলাইমানের দুজনের কাছেই ওভারসিজ পাকিস্তানিজদের জন্য ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড রয়েছে। এই কার্ড থাকলে পাকিস্তানে প্রবেশের জন্য তাদের ভিসার প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।
অন্যদিকে, কাসিম ও সুলাইমান দাবি করেছেন, তাদের ওই কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং সেগুলো নবায়ন করা হয়নি। এ বিষয়ে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের দাবির কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
ইমরানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ চায় অ্যামনেস্টি
ইমরান খান ও বুশরা বিবির পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের তাদের সঙ্গে দেখা করার অধিকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
সংস্থাটি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের প্রতি ইমরান ও বুশরা বিবির পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার অধিকার ‘নিঃশর্তভাবে পুনর্বহাল’ করার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং কথিত একাকী বন্দিত্ব অবিলম্বে বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। অ্যামনেস্টির মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি একাকী বন্দিত্ব আইনসম্মত নয়।
‘৭ মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন’ থাকার দাবি প্রত্যাখ্যান সরকারের
তবে ইমরান খানকে সাত মাস ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে—তার পরিবারের এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার।
সরকারের দাবি, ইমরানের সঙ্গে তার পরিবার, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। বরং কারাগারের নিয়ম, আদালতের নির্দেশ, অনুমোদিত সময়সূচি এবং একজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দির নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় তার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ ইমরান তার এক ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনে কথা বলেছেন। পাকিস্তান সরকারের দাবি, ওই ফোনকলই প্রমাণ করে যে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ নয়।
ইমরানের শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল’: সরকার
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। তাদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে সচেতন ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থায় গুরুতর বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো অবনতি ঘটেনি।
সরকার আরও বলেছে, ইমরান নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ফলোআপ পাচ্ছেন।
কারাগারে ইমরানের থাকার পরিবেশ নিয়েও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। তাদের ভাষ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একটি বিশেষ সাত কক্ষের কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। সেখানে একটি বিছানা, গদি, চারটি বালিশ, কম্বল, টেবিল-চেয়ার, স্যানিটেশন সুবিধা এবং ব্যায়ামের সরঞ্জাম রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি করিডর ও লন।
সরকারের দাবি, এসব সুবিধা থাকার কারণে তাকে বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত বা শাস্তিমূলক পরিবেশে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
‘বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো রিপোর্ট দেখানো হচ্ছে না’
সরকারের বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন ইমরানের দুই ছেলে। কাসিমের দাবি, তাদের বাবার কোনো স্বাস্থ্য প্রতিবেদন তাদের দেখানো হচ্ছে না। ফলে কারাগারে থাকার সময়ে ইমরানের শারীরিক অবস্থার কতটা অবনতি হয়েছে, তা তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
কাসিম বলেন, ‘তারা আমাদের কোনো ধরনের স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দেখাতে অস্বীকার করছে। তাই তার স্বাস্থ্য এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়ে থাকতে পারে।’
ইমরানের দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দিত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন তিনি। তার দাবি, পিটিআইয়ের অনেক নেতা-কর্মী এখনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে ৮৫ জনকে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাবেন না ইমরান?
ইমরান খান পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় যাবেন কি না, সে বিষয়েও কথা বলেছেন তার দুই ছেলে।
সুলাইমানের মতে, এমন কোনো সমঝোতায় ইমরান রাজি হবেন না, যার ফলে অন্য রাজনৈতিক বন্দিরা কারাগারেই থেকে যাবেন। অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের ক্ষেত্রেও সমাধান না হলে ইমরান এককভাবে সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাবেন না বলেই মনে করেন তিনি।
কাসিমও ইমরানের সঙ্গে সরকারের সমঝোতার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন। তবে তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন বলেও উল্লেখ করেছেন।
‘যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের নজর দেওয়া উচিত’
ইমরানের দুই ছেলে শুধু তাদের বাবার মুক্তি নয়, পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
কাসিম বলেন, পাকিস্তানে কী ঘটছে, সে বিষয়ে ‘যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
তিনি বলেন, শুধু ছেলে হিসেবে নয়, পুরো দেশের পরিস্থিতিও তাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। তার দাবি, বিপুলসংখ্যক মানুষ ইমরান খানকে সমর্থন করেন এবং তাকে দেশ পরিচালনায় দেখতে চান। অথচ সেই ব্যক্তিকে কারাগারে রাখা হয়েছে।
ইমরান খান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে তার সরকারের পতন হয়। এরপর বিভিন্ন মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়। ইমরান ও তার সমর্থকেরা এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
ইমরানের দুই ছেলের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর তার শারীরিক অবস্থা, কারাগারে তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পরিবারের অভিযোগের বিপরীতে পাকিস্তান সরকার বলছে, ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি এবং তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। সূত্র: সিএনএন, জাগোনিউজ



















