কনটেন্ট ক্রিয়েশন নিয়েও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, পড়াশোনার সুযোগ যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রে
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করে আয় এখন অনেকের কাছেই সম্ভাবনাময় পেশা। ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি এই কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন স্নাতক পর্যায়ে কনটেন্ট ক্রিয়েশন পড়ানো হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েশন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন ২১ বছর বয়সী ডেসটিনি ম্যাকগোয়ান। তিন বছরের পড়াশোনায় তার খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড। গত জুলাইয়ে তিনি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
এই কোর্সে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবের জন্য ভিডিও ও পোস্ট তৈরি, দর্শক তৈরি ও ধরে রাখা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ এবং কনটেন্ট থেকে আয় করার কৌশল শেখানো হয়।
ডেসটিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। তাই তার কাছে কোর্সটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বানানো শেখার বিষয় ছিল না; বরং ব্যবসা পরিচালনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়—এমন দক্ষতা অর্জনের সুযোগও ছিল।
বর্তমানে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাশন নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেন। পাশাপাশি অন্যদের জন্য ভিডিও বানান এবং টিকটকে সরাসরি পণ্য বিক্রির অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। নির্দিষ্ট আয় প্রকাশ না করলেও ইতোমধ্যে তিনি কনটেন্ট থেকে আয় শুরু করেছেন বলে জানান।
শুধু ভিডিও তৈরি নয়, ব্যবসায়িক দক্ষতাও
ডেসটিনির মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তার ক্যারিয়ারে সহায়ক হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি ২০২২ সালে কনটেন্ট ক্রিয়েশন বিষয়ে এই ডিগ্রি চালু করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির দাবি, কোর্সটিতে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটনেও একই ধরনের কোর্স রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও কনটেন্ট ক্রিয়েশন বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘তিন বছরের ডিগ্রির প্রয়োজন নেই’
তবে কনটেন্ট ক্রিয়েশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেওয়া কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। যুক্তরাজ্যের কনটেন্ট নির্মাতা ‘নাইটেনেটর’ মনে করেন, তিনি এমন কোনো কোর্সে ভর্তি হতেন না। ২০১৫ সাল থেকে গেমিং ও ভ্রমণ নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন তিনি। বর্তমানে টুইচে তার ৬৫ হাজার এবং টিকটকে এক লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। কনটেন্ট তৈরি এখন তার পূর্ণকালীন পেশা। আয়ের বড় অংশ আসে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে।
তার মতে, কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কাজ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ ইন্টারনেটে কনটেন্ট তৈরির বিষয়ে প্রচুর বিনা মূল্যের পরামর্শ ও শিক্ষামূলক উপকরণ রয়েছে। নিজের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বেছে নিয়ে অন্যদের কনটেন্ট দেখে শেখা এবং কাজ শুরু করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
‘ডিগ্রি থাকলে পথটা সহজ হতো’
অন্যদিকে মার্কিন কনটেন্ট নির্মাতা আইশা বিসলির মত ভিন্ন। ফিনিক্সের ৩৬ বছর বয়সী এই নির্মাতা খাবার, ফ্যাশন ও জীবনযাপন নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেন।
তিনি জানান, নিজের ক্যারিয়ার শুরু করার সময় এমন কোনো কোর্স থাকলে তিনি অবশ্যই সেটিতে ভর্তি হওয়ার কথা ভাবতেন। তার মতে, ডিগ্রি থাকলে কনটেন্ট তৈরিকে শখ থেকে আয়ের পেশায় পরিণত করার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোবদ্ধ ও পরিষ্কার পথ পাওয়া যেত।
আইশা মনে করেন, কনটেন্ট তৈরি শেখার পাশাপাশি সেটিকে কীভাবে ব্যবসায় পরিণত করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবসায়িক ধারণাও প্রয়োজন। অনলাইন উপস্থিতি ব্যবসা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় কনটেন্ট ক্রিয়েশনভিত্তিক কোর্সগুলো সময়োপযোগী বলেও মনে করেন তিনি।
দ্রুত বাড়ছে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের বাজার
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ইউটিউবের কনটেন্ট নির্মাতারাই যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড অবদান রাখছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রতি তিনজনের একজন ইনফ্লুয়েন্সার হতে চান। তবে নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির কনটেন্ট ক্রিয়েশন কোর্সের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জ্যাকি গার বলেন, কোর্সে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য শুধু ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া নয়।
তার মতে, কনটেন্ট তৈরি বর্তমানে একটি পেশাগত দক্ষতায় পরিণত হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা নিজস্ব ব্যবসা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এই দক্ষতার প্রয়োজন বাড়ছে।
কোর্সে শিক্ষার্থীদের ভিডিও পরিকল্পনা ও তৈরি, প্রচারাভিযান পরিচালনা, দর্শক বিশ্লেষণ, পারফরম্যান্সের তথ্য পর্যালোচনা এবং সেই অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তনের মতো বিষয় শেখানো হয়। পাশাপাশি কনটেন্ট থেকে আয় এবং এই শিল্পের ব্যবসায়িক দিকও পড়ানো হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিলেই রাতারাতি সফল ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। জ্যাকি গারের মতে, একজন সফল ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার পেছনে অনেক সময় ভাগ্য ও ব্যক্তিত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি শেখানো সম্ভব নয়। সূত্র: বিবিসি, জাগোনিউজ



















