Logo

ক্যাম্পাস    >>   বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের আইনি অধিকার: কী বলে পিতামাতার ভরণপোষণ আইন?

বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের আইনি অধিকার: কী বলে পিতামাতার ভরণপোষণ আইন?

বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের আইনি অধিকার: কী বলে পিতামাতার ভরণপোষণ আইন?

সজিব কুমার চয়ন:

বাবা মা বার্ধক্যে পৌঁছালে তাঁদের সেবাযত্ন ও দেখভাল করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে অনেক মা বাবাই কষ্টে জীবনযাপন করেন। অবহেলার শিকার হয়েও সন্তানদের সুখের কথা ভেবে তাঁরা সবকিছু মেনে নেন। তবে তাঁরা কিছু না বললেও আমাদের দেশে বৃদ্ধ মা বাবার ভরণপোষণ দেওয়ায় রয়েছে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ নামে একটি আইন করা হয়েছে। আইনটি সম্পর্কে অনেকেরই কোনো ধারণা নেই।

মা বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের সঙ্গে সন্তানের বসবাস বাধ্যতামূলক করার বিধান রেখে সরকার এই আইন প্রণয়ন করে। পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর মা ও বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং একাধিক সন্তান থাকলে প্রত্যেককে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তাঁর মা ও বাবাকে অথবা উভয়কে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা অন্য কোথাও একত্রে অথবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। সন্তানেরা তাঁদের মা বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করবেন। শুধু তা নয়, মা বাবাকে নিয়মিত সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টিও আইনে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলে মেয়ে বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান করেন, তাহলে তাঁরাও একই অপরাধে অপরাধী বলে গণ্য হবেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধেও এই আইনের অধীনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ এর ৩(৭) ধারা অনুযায়ী, কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে আলাদাভাবে বসবাস করলে, প্রত্যেক সন্তান তার দৈনিক, মাসিক বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে পিতা বা মাতাকে অথবা উভয়কে প্রদান করবে।

কোনো ব্যক্তি এই আইন অমান্য করলে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তার বিচার হবে। তবে কোনো আদালত বাবা বা মায়ের লিখিত অভিযোগ ছাড়া এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ আমলে নিতে পারবেন না। আইনটিতে আপস নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো প্রবীণ তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযুক্ত সন্তানকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।

২০১৩ সালে করা ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ এর নির্দেশনা অনুসারে পরবর্তীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘পিতা মাতার ভরণপোষণ বিধিমালা, ২০২৩’ প্রণয়ন করে। এই বিধিমালায় বাবা মায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সন্তানের দায়িত্বগুলো আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সন্তানদের উচিত বাবা মায়ের সঙ্গে বসবাস করা, তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো থেকে বিরত থাকা।

তবে কোনো সন্তান যদি বাস্তব কারণে মা বাবাকে নিজের কাছে রেখে ভরণপোষণ করতে সক্ষম না হন, তাহলে সরকারি বা বেসরকারি পরিচালিত পরিচর্যাকেন্দ্রে তাঁদের যথাযথ পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আবার কোনো মা বাবার সন্তান জীবিত না থাকলে কিংবা তাঁদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ না থাকলে, পিতা মাতা ভরণপোষণ কমিটি তাঁদের পরিচর্যাকেন্দ্রে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ ছাড়া বিধিমালায় অসহায় মা বাবার সহায়তার জন্য সরকারি অনুদান এবং দেশি বিদেশি সহায়তায় একটি ‘ভরণপোষণ তহবিল’ গঠনের রূপরেখাও প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবীণ নাগরিকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সজিব কুমার চয়ন—
আইন বিষয়ক বিশ্লেষক ও লেখক;
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়