হামের মহামারী, নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু ও রাষ্ট্রের দায়
- By Progga News Desk --
- 10 May, 2026
নয়ন বিশ্বাস রকি:
বাংলাদেশ আজ এক গভীর স্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ইতোমধ্যে ৩৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শিশু, আর প্রতিদিনই সেই সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। যে শিশুটি আজ হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রাণ হারাচ্ছে, সেই শিশুই একদিন দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দিত, জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেত উন্নয়নের পথে। আজ সেই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎগুলো হারিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের বেডে, মায়ের কোল খালি হয়ে যাচ্ছে, বাবার কাঁধে উঠছে সন্তানের লাশ। কোনো সভ্য রাষ্ট্রে এমন নির্মম বাস্তবতা কখনোই কাম্য হতে পারে না।
স্বাভাবিকভাবেই জনমনে আজ প্রশ্ন উঠছে— রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়?
মহামারী মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি, পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা, অক্সিজেন ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকার সংকট, হাসপাতালে শয্যার অভাব এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযোগ উঠছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীরবতা ও ধীরগতির পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
নাগরিক সমাজের অনেকেই মনে করছেন, স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা এখন মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর মৃত্যু শুধু দুর্ভাগ্য নয়, এটি রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।
অতীতের দিকে তাকালে জনগণের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছিল। সেই সময় দ্রুত টিকা সংগ্রহ, গণটিকাদান এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৃত্যুহার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল। তাহলে আজ হামের মতো বহু পুরনো ও প্রতিরোধযোগ্য রোগে কেন এত শিশুকে প্রাণ দিতে হবে? কেন একটি জাতি আবারও অসহায় হয়ে দেখবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মৃত্যু?
বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
জনগণের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—
প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে আগামী সাত দিনের মধ্যে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত, মৃত্যু ও সুস্থতার সঠিক তথ্য প্রতিদিন জেলাভিত্তিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। তথ্য গোপন নয়, স্বচ্ছতাই পারে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যখাতে অবহেলা বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেই।
চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তা ও আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি।
আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, জনগণের প্রশ্নের উত্তর তাদেরই দিতে হবে। যদি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তবে নৈতিক দায় স্বীকার করার সাহসও থাকতে হবে। কারণ ক্ষমতা কোনো বিশেষাধিকার নয়, এটি মানুষের প্রতি অঙ্গীকার।
ইতিহাস সাক্ষী— জনগণের কান্না কখনো বৃথা যায় না। একটি শিশুর মৃত্যুর আর্তনাদ একদিন রাষ্ট্রের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই। তাই এই সংকট মুহূর্তে নীরব থাকা মানে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান— গুজব নয়, সঠিক তথ্য জানুন। শিশুদের দ্রুত টিকা দিন, সচেতন হোন এবং আশপাশের মানুষকেও সচেতন করুন। শিশুর জীবন নিয়ে রাজনীতি নয়; এখন প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা এবং দ্রুত কার্যকর সমাধান।
নয়ন বিশ্বাস রকি, সমাজ সেবক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা।



















