আমার মুক্তিযুদ্ধের কথা—দেবেশ চন্দ্র সান্যাল
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের চারটি প্রদেশ ছিল। ইহার একটি তদানীন্তন আমাদের পূর্ব পাকিস্তান ও অপর তিনটি আমাদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬০০ কিলোমিটারের অধিক দূরে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তান ও অন্যান্য। নানা আন্দোলন সংগ্রামের পর পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালি শাসক পাকিস্তানের গন ভোট দিতে বাধ্য হয়। গণ ভোট কালীন সময়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন চলছিল। তখন পাকিস্তানের সামরিক শাসন চলছিল। সামরিক শাসক ছিলেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের মোট ৩১৩ টি জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) পদের পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি প্রত্যক্ষ গণ ভোটের ১৬০ টিতে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। পূর্ব পাকিস্তানের ৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসন ছিল। ৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসনেও বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ইহাতে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনের অধিকারী হয়ে নিরস্কুশ সংখ্যা গড়িষ্ঠত লাভ করে। গনতন্ত্রের নিয়ম অনুসারে পাকিস্তানে সামরিক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছিল আওয়ামী লীগ কে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানানো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তা করলেন না। তিনি টাল বানা ও ষড়যন্ত্র করতে থাকলেন। চলমান আলাপ আলোচনা ও আন্দোলনের এক পর্যায়ে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের দ্বারা “অপারেশন সার্চ লাইট” শুরু করলো। পাকিস্তানি প্রশাসনের নির্দেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা “অপারেশন সার্চ লাইট” শুরুর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিল। “অপারেশন সার্চ লাইট” শুরুর হওয়ার পর বাঙালি সৈন্য, পুলিশ, ইপিআর ও অন্যান্যরা প্রথমে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। ২৬ মার্চ’৭১ মধ্য রাতের পর থেকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলো। এই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। ২৬ মার্চ’৭১ এর পর পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করলো।
তারা নির্বিচারে, হত্যা,গণহত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, ধর্ষণ, নিপিড়ন ও অন্যান্য মানবতা বিরোধী নৃশংসতম কাজ করতে থাকলো। জীবন বাঁচাতে দেশের বিভিন্ন নরনারী ভারতে আশ্রয় নেয়। বাঙালি আর্মি, ই.পি.আর.ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যগণ মুক্তিফৌজে ও কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও অন্যান্য নর-নারী গণ বাংলাদেশ কে হানাদার মুক্ত করতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ হীণ কৃষক শ্রমিক, ছাত্র ও অন্যান্যরাও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে বা না নিয়ে মুক্তি বাহিনী/গনবাহিনীতে যোগ দেয়। অস্ত্র ও গোলা বারুদের স্বল্পতার কারণে অনেকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোলা বারুদের জন্য ভারতে চলে যায়। ভারতের পশ্চিম বঙ্গে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত এম.এন.এ ও ১৭ ডিসেম্বর’৭০ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নির্বাাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য(এম.পি এ) দের কে নিয়ে বাংলাদেশের গণপরিষদ গঠন করা হয়।
১০ এপ্রিল’৭১ ভারতের পশ্চিম বঙ্গে স্বাধীন সার্বভৌম গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল’৭১ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার ভবের পাড়ার বৈদ্যনাথ তলায় গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বৈদ্যনাথ তলাকে মুজিব নগর নাম করণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দেশের ক্রান্তি কালে আমি জীবন পণ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ছিলাম। বাবা মা ও বাড়ির অন্যান্য কাউকে না জানিয়ে সাথী অন্যান্যদের সাথে ভারতে গিয়েছিলাম। ভারতে মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষন গ্রহণ করে ছিলাম। আমি ৭ নম্বর সেক্টরাধীন দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানি ঘাটা নামক ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেছিলাম।
আমাকে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এল এম জি ষ্টেন গান হ্যান্ড গেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র ও গেরিলা যুদ্ধে কলা কৌশল শিখানো হয়। ট্রেনিং সেন্টারে আমার এফ.এফ নং-৪৭৪২ বরাদ্দ করা হয়। প্রশিক্ষনের পর আমাদেরকে পানি ঘাটা থেকে নিয়ে আসা হয় ৭ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার কালিয়াগঞ্জ থানার তরঙ্গপুরে। তরঙ্গপুর থেকে আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গেরিলা গ্রুপ করা হয়। অস্ত্র ও গোলা বারুদ দেওয়া হয়। আমার নামে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, একটি হেলমেট, এক ম্যাগজিন ও এক বেল্ট গুলি ইস্যু করা হয়। অন্যান্য গোলা বারুদ, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, পকেট মানি, রেশনিং এ্যালাউন্স এর টাকা ও অন্যান্যা সামগ্রী আমার গ্রুপ লিডার/ কমান্ডার কে দেওয়া হয়ে ছিল। আমার গ্রুপ লিডার/ কমান্ডার নিযুক্ত হন সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার (বর্তমানে উপজেলা) তামাই গ্রামের জনাব গাজী মো: আব্দুল মান্নান। ডেপুটি লিডার/কমান্ডার (সেকেন্ড ইন কমান্ড) নিযুক্ত হন শাহজাদপুর থানার জামিরতা গ্রামের রবীন্দ্র নাথ বাগচী। আমরা সবাই গ্রুপ নিয়ে চলে আসি বেলকুচি থানার বিভিন্ন গ্রামে। আমার গ্রুপ লিডার/ কমান্ডার ও রণাঙ্গনের সাথী অন্যান্যদের বলেছিলাম- আমার জন্য পাগল প্রায় হয়ে আমার বাবা-মা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভারতের আসামের মানিকারচর শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।
আমার লাশ নেওয়ার মত আমার পরিবারে কোন সদস্য বাংলাদেশে নাই। আমি রনাঙ্গনে বীর গতি প্রাপ্ত হলে (মারা গেলে) আমার লাশ তরঙ্গপুর থেকে কেনা জাতীয় পতাকা দিয়ে জলে দিয়ে দিবেন। আমি দুই জন কমান্ডারের অধীনে ৪টি ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি। কমান্ডার গাজী মো: আব্দুল মান্নান এর নেতৃত্বাধীন হয়ে (১) সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানা অপারেশণ যুদ্ধ,(২) সিরাজগঞ্জ সদর থানার কালিয়া হরিপুর ও জামতৈল রেলওয়ে ষ্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে এ্যাম্বুস ও (৩) সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার কল্যানপুর যুদ্ধ। ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্র নাথ বাগচীর নেতৃত্বাধীন হয়ে শাহজাদপুর থানার (বর্তমানে উপজেলা) সোনাতনী ইউনিয়াধীন ধীতপুর নামক ওয়াপদা বাঁধের যুদ্ধে। আমার অংশগ্রহন করা যুদ্ধগুলির বিবরণ হলো:-
১. বেলকুচি থানা অপারেশন :
বেলকুচি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য থানা। এই থানা অপারেশনে নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান স্যার। অক্টোবর’৭১ এর প্রথম সপ্তাহে কমান্ডার স্যারের ও আরো ৩ জনের রেকিতে একযোগে বেলকুচি থানা ও মুসলিমলীগ নেতা মোঃ আব্দুল মতিনের বাড়ি আক্রমন করে ছিলাম।
সন্ধ্যায় বানিয়া গাতি শেল্টারে কমান্ডার স্যার বিস্তারিত ব্রিফ করে ছিলেন। কমান্ডার স্যার আমাদের গ্রুপ কে দুই গ্রুপে ভাগ করে দিয়ে ছিলেন। সিদ্ধান্ত ছিল কমান্ডার স্যারের নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আক্রমন করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্র নাথ বাগ্চীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতা মো: আব্দুল মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমন করে মতিন সাহেবকে ধরে আনবে। আমি কমান্ডার স্যারের গ্রুপে থেকে থানা অপারেশণ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ছিলাম। রাত ৯ টায় বানিয়া গাতি শেল্টার থেকে যাত্রা করে ছিলাম। থানার কাছে গিয়ে দু গ্রুপ টার্গেটের উদ্দেশ্যে ভাগ হয়ে ছিলাম। রাত ১২টায় একযোগে আক্রমনের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা মোতাবেক আমাদের গ্রুপ ও আমির হোসেন ভুলু এর গ্রুপ সহ অন্যান্য গ্রুপ থানার পশ্চিম পাশ দিয়ে স্ক্রোলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেলে ছিল। হুইসেল বাঁজিয়ে থানার সবাইকে জানিয়ে দিয়ে আমাদের কে লক্ষ্য করে সেন্ট্রি গুলি করা শুরু করে ছিল। তাঁরপর আমাদের গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান স্যার কমান্ড করে ফায়ার ওপেন করে ছিলেন।
কমান্ডার স্যারের কমান্ড পেয়ে আমরা সবাই একযোগে গুলি শুরু করে ছিলাম। আমাদের গ্রুপে সহযোগী ছিল এলাকায় শ্লেটার নেওয়া জনাব মো: আমির হোসেন ভূলু এর গ্রুপ সহ অন্যান্য আরো কয়েকটি গ্রুপ। প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপী যুদ্ধ হয়ে ছিল। যুদ্ধটি ছিল ভয়াবহ যুদ্ধ। আমার মাথায় হেলমেট ছিল। দুইটি গুলি এসে আমার হেলমেটে লেগে ছিল। আমার ডান পাশে অবস্থান নিয়ে ছিলেন যুদ্ধের কমান্ডার। বিজয় আর না হয় মৃত্যু ছাড়া কোন পথ ছিল না। আমরা সবাই বৃষ্টির মত গুলি চালাচ্ছিলাম। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কমান্ডার স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন-“দেবেশ, মাথা তুলো না গুলি চালিয়ে যাও”। আমাদের গুলির কাছে হেরে গিয়ে থানার পুলিশ ও রাজাকারেরা থানার পিছনদিক দিয়ে পালিয়ে সোহাগপুর নদীতে থাকা একটি লঞ্চে আমাদের রেঞ্জের বাইরে যমুনা নদীর মাঝ স্থানে চলে গিয়ে ছিল। থানার সেন্ট্রি গুলি করা বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করলো। তারপর আমরা সবাই থানার ভিতরে ঢুকে পড়ে ছিলাম। থানার মাল খানা থেকে সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ছিলাম। এই যুদ্ধে আমরা দু’জন রাজাকারকে ধরে নিয়ে এসে ছিলাম। ভোর হয়ে গিয়েছিল। মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমন করা দলটিও এলো। মতিন সাহেব পালিয়ে গিয়েছিল। তাকে ধরা সম্ভব হয় নাই। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে অধিকাংশ বাড়ি ও দোকানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরি করে রেখে ছিল।
আমাদের বিজয় দেখে স্বতঃফুর্ত আনন্দে থানার আশেপাশের লোকজন দোকান ও বাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়ে ছিলেন। আমরা বিজয়ী হয়ে কিছু সময় উল্লাস করে শেল্টারে চলে এসে ছিলাম। ধরে আনা রাজাকার দু’জন কে প্রথমত চোখ বেঁধে আমাদের শেল্টারের রুমের পার্শ্বের রুমে রাখা হয়েছিল। আমি আমার কমান্ডার স্যারের অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে রাজাকার দুই জনের কাছে রাজাকার হওয়ার প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য জিজ্ঞাসা বাদ করলাম। রাজাকার দুই জন ছিল সাধারণ মানুষ। তাদের কাছ থেকে জানা গিয়েছিল তারা কাউকে অত্যাচার করে নাই। তারা একটি চাকরি ভেবে রাজাকারে যোগ দিয়েছিল। রাজাকার দু’জন কে দেখে সহজ সরল ও ভালো মানুষ মনে হলো। আমি তাদের চোখ বাধা খুলে দিলাম। আমাদের সমান তালে তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। রাতে শ্লেটার পরিবর্তনের সময়ে কমান্ডার স্যার কে বললাম- স্যার রাজাকার দুই জন ভালো মানুষ, তারা কারো ক্ষতি করে নাই। তাদের বাড়িতে স্ত্রী পুত্রাদি আছে। তারা গরিব মানুষ। দয়া করে এদের কে ছেড়ে দিন।” আমাদের কমান্ডার স্যার ছিলেন খুব ভালো মানুষ। ছোট মানুষ হিসেবে আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার কথায় সম্মত হয়ে তিনি রাজাকার দুই জন কে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিলেন। রাতে শেল্টার পরিবর্তনের সময় আমি ও দৌলতপুরের মো: শামসুল হক রাজাকার দুইজন কে ছেড়ে দিয়ে কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে এসে ছিলাম।
পরদিন সিরাজগঞ্জ থেকে শতাধিক পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য এসে বেলকুচি থানার আশে পাশে আগুন দিয়েছিল এবং মানুষদের নির্যাতন করেছিল। ঐ রাতের জন্য কমান্ডার স্যার আমাদের পাশ ওয়ার্ড দিয়ে ছিলেন শাপলা ও গোলাপ।
২. কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন সন্নিকটে এ্যাম্বুস :
কালিয়া হরিপুর স্টেশন ও জামতৈল স্টেশনের মাঝ পথে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের কাছে আমরা এ্যাম্বুস করেছিলাম। কালিয়া হরিপুর সিরাজগঞ্জ জেলার সদর থানার একটি রেলওয়ে স্টেশন। নভেম্বর’৭১ মাসের প্রথম সপ্তাহে। এই এ্যাম্বুসের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান। ঐ রাত ১১টার দিকে আমাদের গ্রুপের ঝাঐল গ্রামের জনাব মোঃ আব্দুল হামিদ তালুকদারের রেকি ও তথ্যের ভিত্তিতে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন ও জামতৈল স্টেশনের মাঝ পথে আমরা এ্যাম্বুস করেছিলাম। কমান্ডার স্যার ক্রোলিং করে রেল লাইনে বৈদ্যুতিক মাইন বসিয়ে এসে ছিলেন। গ্রুপ কমান্ডার স্যার ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে ছিলেন। আমরা সবাই ধানক্ষেতের মধ্যে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। কামান্ডার স্যারের হাতে মাইনের তার ও ব্যাটারী। টর্চ লাইট ও হ্যারিকেন হাতে পাকি মিলি শিয়া ও রাজাকারেরা টহল দিচ্ছিল। ওদের পায়ে লেগে হঠাৎ আমাদের মাইনের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে ছিল। মাইনটি পাকি হানাদারদের নজরে পড়ে ছিল। পাকি হানাদাররা হুইসেল দিয়ে রাজাকারদের লাইং পজিশনে রেডি থাকতে কমান্ড করলো। আমাদের দিকে টর্চ লাইট মেরে মেরে উর্দূতে আমাদের কে উদ্দেশ্য করে বকাবকি করতে থাকলো। এমন সময় ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জ গামী পাকিস্তানি সৈন্য বাহী ট্রেন এলো। কালিয়া হরিপুর ষ্টেশনের পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও অন্যান্যরা সিগন্যাল দিয়ে ষ্টেশনে ট্রেনটি থামিয়ে দিল। ট্রেনের পাকি হানাদারেরা অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নেমে আমারকে কে খুঁজতে থাকলো। আমাদের মাইনটি ব্রাষ্ট করা সম্ভব হলো না। পাকি হানাদারদের সংখ্যাধিক্যতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমান্ডার স্যার উইথড্র হওয়ার কমান্ড করলেন। আমরা ক্রোলিং করে কিছু দূর পিছিয়ে এসে হেঁটে রাত ১২.০০ টার দিকে তামাই গ্রামে চলে এসে ছিলাম। পরের দিন সিরাজগঞ্জ থেকে পাকি হানাদার ও রাজাকারেরা এসে কালিয়া হরিপুরের আশেপাশে বিভিন্ন গ্রামের কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং গ্রামের কয়েক জন কে ধরে নির্যাতন করেছিল। আমরা এ্যাম্বুস থেকে ফিরে এসে তামাই গ্রামে কমান্ডার স্যারের বাড়িতে একত্রিত হই। কমান্ডার স্যারের মা আমাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
আমরা কমান্ডার স্যারের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের সবাইকে বসিয়ে কমান্ডার স্যার ব্রিফ করলেন। স্থানীয় ভাবে ট্রেনিং দেওয়া বেশ কিছু যুবককে আমাদের গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। এত বড় প্লাটুন এক শেল্টারে শেল্টার নেওয়া সমস্যা। তাই কমান্ডার স্যার ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগ্চী কে কমান্ডার করে আমাদের কয়েক জনের আর একটি গ্রুপ তৈরি করে দেওয়া সিদ্ধান্ত নিলেন। পরস্পর যোগযোগ রেখে কাজ করার জন্য বিভিন্ন নিদের্শনা দিলেন। তারপর আমরা বেলকুচি থানার একটি অজ পাড়া গাঁয়ে শেল্টার নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ঐ রাতে কমান্ডার স্যার আমাদের পাশ ওয়ার্ড দিয়েছিলেন শাপলা ও জবা।
৩. কল্যাণপুর যুদ্ধ:
কল্যাণপুর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান। তামাই গ্রাম থেকে সারারাত হেঁটে বেলকুচি থানার কল্যাণপুর নামক গ্রামে কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। নভেম্বর’৭১ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্রামের নেতৃস্থানীয়রা আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করলেন।
আমরা সারারাত নিদ্রাহীন থেকে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সকালের খাবার খেয়ে প্রকাশ্যে পিটি, প্যারেড করলাম। অস্ত্র পরিষ্কার করলাম। অস্ত্রে ফুলথ্রু মারলাম। দুইজন করে করে ডিউটি করতে থাকলাম। অন্যান্যরা ঘুম বা বিশ্রামে থাকলাম। কল্যানপুর একটি নিভৃত গ্রাম। আমাদের ধারনা ছিল এই গ্রামে পাকি হানাদার ও রাজাকার আসবে না। বেলা ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে জানালেন আমাদের কে ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন পাকি হানাদার মিলে শিয়া ও রাজাকার আসছে। বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কল্যানপুরের দিকে আসতে ছিল। দুইজন পাকিস্তানি দালাল পরিচয় গোপন রাখার জন্য গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আস ছিল। দূর থেকে অনুমান হলো এই দলে ৫ জন মিলেশিয়া ও ৮ জন রাজাকার আছে। আমাদের কমান্ডার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা কল্যানপুর রাস্তার দক্ষিন ধারে বাংকারের মত বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে পজিশন নিলাম। বাঁশ ঝাড়ের সামনে দিয়ে চলা রাস্তা ধরে পাকিস্তানি মিলেশিয়া ও রাজাকারেরা আসছিল।
আমাদের রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে কমান্ডার স্যার কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করলেন। এক লাফে হানাদারেরা রাস্তার উত্তর পার্শে¦ পজিশন নিল। ওরাও আমাদের কে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে ছিল। আমরাও একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকলাম। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশে পাশে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদের সহযোগীতা করার জন্য এগিয়ে এসে ছিলেন। এক ঘণ্টার অধিক সময় সম্মুখ যুদ্ধ চলছিল। তারপর পাকি হানাদারেরা পিছিয়ে গিয়ে ছিল। যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা বিজয় উল্লাস করে ছিলাম। সকল স্তরের মানুষের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হলো। কয়েকটি বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে ছিলাম। তারপর কমান্ডার স্যারের নির্দেশে রবীন্দ্র নাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন পিড়ারচর, খাসিয়ার চর ও অন্যান্য কয়েকটি গ্রাম হয়ে আমরা কয়েক জন হেঁটে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মোঃ শামসুল হকের বাড়িতে এসে শেল্টার নিয়ে ছিলাম। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঞাশিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য গ্রামে শেল্টার নিয়ে থাকলাম। প্রতিদিন রাতে কমান্ডার পাসওয়ার্ড দিতেন। প্রতিদিন সকালে অস্ত্রে ফুল থ্রু মারা হতো ও তেল দেওয়া হতো। প্রতিদিন পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাম্প ও রাজাকার ক্যাম্প আক্রমন করার জন্য গ্রুপ করে করে রেকি করতাম।
৪. ধীতপুর যুদ্ধ:
“১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার (বর্তমানে উপজেলার) সোনাতনী ইউনিয়নাধীন ধীতপুর নামক স্থানে ওয়াপদা বাঁধে পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি যুদ্ধ হয়েছিল। তখন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিল দাড়প্রান্তে। আমরা প্রতি ক্ষনে ভাবছিলাম পরবর্তী সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। ২১ নভেম্বর মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। ৪ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বিভিন্ন রণাঙ্গনে যৌথ ভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। ৬ ডিসেম্বর প্রথমে ভূটান ও পরে ভারত আমাদের বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি দিয়েছে। সারাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা দেশ ও বিদেশে পালিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। রাজাকারেরা বিভিন্ন ক্যাম্প ছেড়ে অস্ত্র সহ অথবা অস্ত্র বিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করছে।
যারা হিন্দুদের মালামাল লুট করে নিয়েছিল তারা লুটের মাল হিন্দুদের কে ফেরত দিয়ে মিল করছে। স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ মানুষ পরস্পর মিল করছে। আমাদের গ্রামের একমাত্র রাজাকার ছিল বাইনা রাজাকার। সে করশালিকা রাজাকার ক্যাম্পে ভর্তি হয়েছিল। সে আমার খোঁজ পেয়ে তার সাথী আর কয়েক জন রাজাকার কে সাথে নিয়ে এসেছে আত্মসর্মপ করার পরামর্শ নিতে। ১২ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যমুনা নদী পাড় হয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য মালিপাড়া রাজাকার ক্যাম্পে এসেছে। মালিপাড়া রাজাকার ক্যাম্প থেকে পথ চিনানোর জন্য দুইজন রাজাকার কে সাথে নিয়েছে। ওয়াপদা বাঁধ ধরে পালিয়ে যাচ্ছে। ১২ ডিসেম্বর আমাদের গ্রুপটি ছিল সৈয়দপুর নামক গ্রামের কালা চক্রবর্তী ও আখর হাজী সহ অন্যান্যের বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে কয়েক জন যুবক এসে আমাদের কে পাকিস্তানি সৈন্যদের পালানোর খবর দিল। সংবাদ পেয়ে কৈজুরী গ্রাম থেকে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পিছু নিলাম।
তখন আমাদের কমান্ডার ছিলেন রবীন্দ্র নাথ বাগচী। কমান্ডারের নির্দেশ ছিল, পাকিস্তানি সৈন্যরা পালিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাদের লোকজনদের কোন ক্ষতি না করলে। আমরা ওদের কে আক্রমণ করবো না। পাকিস্তানি সৈন্যরা ওয়াপদা বাঁধ ধরে বেড়া থানার দিকে যাচ্ছিল। আমরা নিরাপদ দূরতে¦ থেকে গোপন পথে ওদেরকে ফলো করে চলছিলাম। পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল ক্ষুধার্ত। ওরা কৈজুরীর এক কৃষকের ক্ষেত থেকে মুলা তুলে খাওয়ার চেষ্টা করল। ওরা ভীষন ক্রোধি। ধীতপুর গ্রামের কাছে গিয়ে ওরা আমাদের কে দেখে ফেললো। ওরা আমাদের দিকে অস্ত্র উচিয়ে ধরলো। আমরা জাম্প করে ওয়াপদা বাঁধের পশ্চিম পাশে পজিশন নিলাম। ওরাও জাম্প করে বাঁধের পূর্ব পাশে পজিশন নিল। ওরা পজিশন নিয়ে আমাদের উপর গুলি চালাতে থাকলো। আমাদের কমান্ডার রবীন্দ্র নাথ বাগচী ফায়ার অপেন করলেন এবং আমাদের কে ফায়ার করার নির্দেশ দিলেন। শুরু হলো গুলি ও পাল্টা গুলি। পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল পেশাদার, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত।
ওদের সাথে যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া খুব কঠিন ছিল। ওরা আমাদের উপর বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকলো। কি ভয়াবহ যুদ্ধ। আমার মাথার ওপর দিয়ে চো-চো করে গুলি যাচ্ছে। এ যুদ্ধে পরাজিত হলে ওরা আমাদের সবাইকে নৃশংস ভাবে হত্যা করবে। আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন রবীন্দ্র নাথ বাগচী। তিনি এল.এম.জি চালাচ্ছিলেন। তাঁর ডান পাশে ছিল আমার অবস্থান। আমার ডান পার্শ্বে ছিল আমার মেজ দাদা সমরেন্দ্র নাথ সান্যাল। আমি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল চালাচ্ছিলাম। আমার পার্শ্বে অবস্থান নিয়ে ছিলেন আমার গ্রুপের অন্যান্যরা। আমাদের গ্রুপের ডান পার্শ্বে অবস্থান ছিল বেড়া থানার এস এম আমির হোসেনের গ্রুপ। আমাদের যুদ্ধের সংবাদ শুনে শাহজাদপুরের কাদাই বাদলা গ্রামের মো: সিরাজুল ইসলাম এর গ্রুপ, উল্টাভাব গ্রামের জনাব মো: আব্দুল হাই এর গ্রুপ ও অন্যান্য গ্রুপ। বেড়া থানার এস.এম. আমির হোসেন এর গ্রুপ, বেলকুচি ও চৌহালী থানার অন্যান্য গ্রুপ এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। গোলা গুলির এক পর্যায়ে আমাদের পক্ষের বেড়ার এস.এম. আমির হোসেনের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা বৃশালিকা গ্রামের অধিবাসী ও বেড়া বিবি হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র জনাব মো: আব্দুল খালেক ও ছেচানিয়া গ্রামের অধিবাসী মো: আমজাদ হোসেন গুলি বৃদ্ধ হলেন। দুইটা গুলি এসে আমার হেলমেটে লাগলো। আমাদের গ্রুপের ডান পাশেই গুরুতর আহত বীর মুক্তিযোদ্ধা দুইজন যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলেন।
তাদের গ্রুপে মুক্তিযোদ্ধারা কেহ কেহ তাদের যন্ত্রনা লাঘবের চেষ্টা করছেন। যুদ্ধও বন্ধ করা যাবে না। যুদ্ধ বন্ধ করলে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের ধরে ফেলবে। আমি ও অন্যান্যরা সবাই গুলি চালিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে অন্ধকার নেমে এলো। পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করা প্রায় বন্ধ করলো। ওদের দেখা দেখি আমরাও গুলি করা বন্ধ করলাম। সারারাত আমরা না খেয়ে পজিশন অবস্থায় থাকলাম। রাতে রাজাকার দ’ুজন মাঝে মাঝে দুই একটা কভারিং ফায়ার করছে। তাদের গুলির জবাবে আমরাও ২/১ টা করে গুলি করছি। ভোরে আমাদের কমান্ডার ও অন্যান্যরা রাজাকার দু’জন কে ঘিরে ধরে সারেন্ডার করালেন। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নেওয়া হলো। রাজাকার দুই জনের কাছ থেকে জানা গেল। রাত ১২ টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্রোলিং করে পিছিয়ে এসে রাজাকার দুই জন কে কভারিং ফায়ারের নির্দেশ দিয়ে ওয়াপদা বাঁধ ধরে পালিয়ে গেছে।
পরে জানা গেল পাকিস্তানি সৈন্যরা ভেড়া কোলা হলদারদের নৌকায় বেড়া নদী পার হয়ে নগর বাড়ি হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পালিয়ে গেছে। সকালে দেখা গেল ওয়াপদা বাঁধের উপর দুই জন সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সময়ে গুলি লেগে মারা গেছেন। আমাদের পক্ষের বেশ কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছেন। এস.এম আমির হোসেন ভাইয়ের গ্রুপের গুরুতর আহত দুই জন কে বেড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরে জানা গেছে এস.এম. আমির হোসেন ভাইয়ের গ্রুপের জনাব মো: আব্দুল খালেক ও মো: আমজাদ হোসেন দুই জনই শহিদ হয়েছেন। ধীতপুর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমাদের গ্রুপ জামিরতা হাই স্কুলে ক্যাম্প করে আশ্রয় নিলাম। ঐ দিনই অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর শাহজাদপুর থানা হানাদার মুক্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে থাকাতদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানেহলো। ১৬ ডিসেম্বর’৭১ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একানব্বই হাজারাধিক পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগী অন্যান্যের পক্ষে জেনারেল নিয়াজী কিছু পাকিস্তানি আর্মি অফিসার নিয়ে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে ছিলেন।
১৭ ডিসেম্বর’৭১ ভারতীয় হেলিকপ্টারে আমাদের যৌথ বাহিনীর উর্ধতন অফিসার ও অন্যান্যরা কয়েকটি বিমান নিয়ে বাংলাদেশের আকাশ পথে ঘুড়ে যুদ্ধত্তোর স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থা দেখে ছিলেন। একটি বিমান গুলি আমাদের জামিরতা হাই স্কুল ক্যাম্পের উপর দিয়ে গিয়ে ছিল। হানাদার মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। ২৪ জানুয়ারী ১৯৭২ সোমবার সিরাজগঞ্জ সদরস্ত ইব্রাহিম বিহারীর বাসায় স্থাপিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা নেওয়া ক্যাম্পে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে আমার মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব শেষ করেছিলাম।
লেখক পরিচিতি : দেবেশ চন্দ্র সান্যাল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর বর্তমান বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার ঘোষগাঁতী মহল্লায়।
মোবাইল নং: +৮৮ ০১৭১৩৭৪১৬৮৬
ইমেইল: debesh00007@gmail.com



















