জ্ঞান ও সংস্কৃতির বাতিঘর অধ্যাপক যতীন সরকার: প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের গভীর শ্রদ্ধা
কল্লোল দাশ:
গত বছর ১৩ আগস্ট আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও জ্ঞানতাপস অধ্যাপক যতীন সরকারকে। তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি পরিবারের নয়, বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলনের অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা।
অধ্যাপক যতীন সরকার ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেননি; তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সত্য, যুক্তি, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার পথে চলার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার বিষয় নয়—শিক্ষা ছিল মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার, সমাজকে আলোকিত করার এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি।
১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া যতীন সরকার দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজচিন্তা নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন। ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে দীর্ঘ চার দশক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়িয়েছেন। প্রান্তিক জনপদে থেকেও তাঁর চিন্তা ও মননের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও আত্মিক। তিনি দুই মেয়াদে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। উদীচীর সাংস্কৃতিক চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, মানুষের মুক্তি এবং শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শকে তিনি নিজের জীবন ও কর্মের সঙ্গে একীভূত করেছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পরও উদীচী তাঁকে গান, কবিতা, আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে।
অধ্যাপক যতীন সরকারের লেখনী ছিল তাঁর আরেক শক্তিশালী পরিচয়। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে তিনি দেখেছেন গভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে। তাঁর রচনায় ছিল দেশ, মানুষ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি ছিলেন নিছক লেখক নন—ছিলেন একজন মননশীল সমাজচিন্তক, যিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে পাঠককে প্রশ্ন করতে, ভাবতে এবং সত্য অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। গবেষণা ও প্রবন্ধ সাহিত্যে তিনি ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।
১৩ আগস্ট ২০২৫ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁকে বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করেছে।
কিন্তু সত্যিকারের মনীষীদের মৃত্যু হয় না। তাঁদের শরীরের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু তাঁদের চিন্তা, দর্শন, আদর্শ ও সৃষ্টিশীল কর্ম বেঁচে থাকে মানুষের মধ্যে, প্রজন্মের পর প্রজন্মে। অধ্যাপক যতীন সরকারও তাঁর অগণিত ছাত্র, পাঠক, সহযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে এই জ্ঞানতাপসকে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়; সংস্কৃতি মানুষের চেতনা জাগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয় এবং একটি মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের পথ দেখায়।
অধ্যাপক যতীন সরকারের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষাদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনব্যাপী সংগ্রাম আমাদের চলার পথে চিরপাথেয় হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর আদর্শকে ধারণ করাই হতে পারে তাঁর প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।
জ্ঞান, যুক্তি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির যে মশাল অধ্যাপক যতীন সরকার বহন করে গেছেন—সেই মশাল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্বালিয়ে রাখার প্রত্যয়ই হোক তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর অঙ্গীকার।
কল্লোল দাশ
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
যুক্তরাষ্ট্র সংসদ



















