৩৫ হাজার ৩২১ ভোটারের চোখ বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে: সেলিম–আলী ও কুনু–ফিরোজ পরিষদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই—পাঁচ বুরোতে পোস্টার-ব্যানারে সরগরম নিউইয়র্ক, রাতদিন চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক :
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের নির্বাচনকে ঘিরে এখন সরগরম পুরো নিউইয়র্ক। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রচারণার উত্তাপ। কুইন্স থেকে ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস থেকে ম্যানহাটন, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড—বাংলাদেশি অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা এখন পোস্টার, ব্যানার ও নির্বাচনী প্রচারণায় ছেয়ে গেছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় চলছে সভা, মতবিনিময়, কর্মী সমাবেশ ও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ।
আগামী ২৫ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সোসাইটির বহুল আলোচিত নির্বাচন। এবারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় মোট ভোটার ৩৫ হাজার ৩২১ জন। এর মধ্যে লাইফ মেম্বার রয়েছেন ১ হাজার ২৬ জন। বিপুলসংখ্যক ভোটার নিয়ে অনুষ্ঠিতব্য এবারের নির্বাচন বাংলাদেশ সোসাইটির ইতিহাসে অন্যতম বড় নির্বাচনী আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, অ্যাস্টোরিয়া, জ্যামাইকা, ওজনপার্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিনই দুই পরিষদের প্রার্থীদের নির্বাচনী তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। একইভাবে ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার, ব্রুকলিনের ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউ, চার্চ অ্যাভিনিউ, লিবার্টি অ্যাভিনিউসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাতেও চলছে ব্যাপক প্রচারণা। ম্যানহাটন ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডেও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা।
দুই প্রধান পরিষদ—সেলিম–আলী ও কুনু–ফিরোজ—প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় সভা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে। যেখানে ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেখানেই প্রার্থীদের উপস্থিতিও বেশি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, ফোনে ও সরাসরি সমর্থন চাওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ।
এবারের নির্বাচনে সেলিম–আলী পরিষদ থেকে সভাপতি পদে আতাউর রহমান সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে কুনু–ফিরোজ পরিষদ থেকে সভাপতি পদে আজমল হোসেন কুনু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ফিরোজ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দুই পূর্ণাঙ্গ পরিষদে কার্যকরী পরিষদের ২১টি পদে মোট ৪২ জন প্রার্থী রয়েছেন। এর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন, ফলে বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বহুমাত্রিক হয়েছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে কুইন্স প্যালেসে বাংলাদেশ সোসাইটি নির্বাচন কমিশনের আয়োজনে মনোনয়নপত্র জমাদান অনুষ্ঠানে দুই পরিষদের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। স্লোগান ও সমর্থকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থলে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুধু মাঠের প্রচারণাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচার। ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও পত্রিকায় দুই পরিষদের প্রার্থীরা নিজেদের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চলছে নানা ধরনের প্রচার ও প্রচারণা।
নির্বাচনী প্রচারণার উত্তাপ এখন পৌঁছে গেছে রাতের আড্ডাতেও। নিউইয়র্কের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে চা কিংবা রাতের খাবারের টেবিলে চলছে বাংলাদেশ সোসাইটির ভোটের হিসাব। কোন এলাকায় কত ভোট, কোন প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক কতটা শক্তিশালী, কোন সংগঠন কোন পরিষদের পক্ষে কাজ করছে—এসব নিয়েই চলছে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও হিসাব-নিকাশ। কোথাও আবার একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সমালোচনাও শোনা যাচ্ছে।
নির্বাচনের প্রভাব পড়েছে নিউইয়র্কের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কমিউনিটি সংগঠনের মধ্যেও। বড় বড় কিছু সংগঠন ও তাদের নেতৃবৃন্দকে দুই পরিষদের পক্ষে পৃথকভাবে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের পরিচিত অনেক সামাজিক ও সাংগঠনিক সম্পর্কের মধ্যেও নির্বাচনী সমীকরণের প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে।
প্রজ্ঞা নিউজের পক্ষ থেকে নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। অনেক ভোটার জানিয়েছেন, তারা প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, পূর্বের কর্মকাণ্ড, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ সোসাইটির জন্য তাদের অঙ্গীকার বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।
আবার কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণাও পাওয়া গেছে যে, দুই পরিষদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হতে পারে। তবে ভোটের ফলাফল নিয়ে এখনই নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কারণ ৩৫ হাজারের বেশি ভোটারের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কতজন ভোট দেবেন এবং বিভিন্ন পদে ভোটাররা কীভাবে ভোট প্রদান করবেন, তার ওপর নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে।
দুই পরিষদের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও নিজস্ব ভোটব্যাংকও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ভোটারদের কেউ কেউ মনে করছেন। বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্যানেলভিত্তিক ভোটের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের কমিউনিটি কর্মকাণ্ডও ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ সোসাইটির এবারের নির্বাচন তাই শুধু একটি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নিউইয়র্কের বৃহৎ বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক ও সাংগঠনিক পরিমণ্ডলেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্রতিদিনের প্রচারণা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ভোটারদের আগ্রহ ও প্রত্যাশা।
২৫ অক্টোবরের ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রধান লক্ষ্য একটাই—যত বেশি ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং নিজেদের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট নিশ্চিত করা। শেষ পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৩২১ ভোটারের রায় কার পক্ষে যায়, কোন প্রার্থীরা বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্বে আসেন এবং নির্বাচনের পর সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি।



















