আজকের নারী ও বর্তমান সমাজ: নারী জেগেছে, সমাজ কি বদলেছে?
সুলেখা পাল:
একসময় নারী ছিল সমাজ ও পরিবারের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। কিন্তু সামাজিক বিবর্তনের নানা পর্যায়ে সেই কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে নারীকে গৃহের চার দেয়ালে আবদ্ধ করে ফেলা হয়। গৃহবন্দী জীবনে নারীকে শুধু অবহেলা নয়, নানা ধরনের লাঞ্ছনা, নির্যাতন ও অমর্যাদারও শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু নারীর অন্তর্নিহিত চেতনা, আত্মমর্যাদা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।
অত্যাচার ও বঞ্চনার অন্ধকার পেরিয়ে নারী ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। আবেগ ও কোমলতার গণ্ডি অতিক্রম করে বাস্তব জীবনের কঠিনতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে এবং আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে গেছে।
নারীর এই জাগরণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়েছে শিক্ষা। একসময় সমাজের একটি বড় অংশই মনে করত, নারীর লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই। আবার অনেক দূরদর্শী অভিভাবক নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। সেই সীমিত পরিসর থেকে শুরু হওয়া নারীশিক্ষার পথ আজ বহুদূর এগিয়েছে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে নারী সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে।
আজ উচ্চশিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রীড়া ও পেশাজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি। পুরুষের পাশাপাশি সমান দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নারীরা এগিয়ে চলেছে। কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের পাশাপাশি পরিবার, সন্তান প্রতিপালন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও অসংখ্য নারী নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—নারীর এই অগ্রগতি কি তাকে সমাজে যথেষ্ট সম্মান ও নিরাপত্তা এনে দিতে পেরেছে?
প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, সহিংসতা, অপরাধ, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার নানা দিকও উদ্বেগজনকভাবে দৃশ্যমান। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সংযমের অভাব অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ধর্মীয় উন্মাদনা বাড়লেও প্রকৃত অর্থে নৈতিকতা, মানবিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা কতটা বাড়ছে—সেটিও ভাবার বিষয়। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই অশালীনতা, দায়িত্বহীনতা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থতা সমাজের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু নারীর ওপর সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
নারী শুধু জননী, জায়া কিংবা কন্যা নন; তিনি সমাজের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক, একজন মানুষ এবং পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি। পরিবারকে ধারণ করা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই নারীর অবদান আজ অনস্বীকার্য।
একটি সুন্দর, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারীকে যেমন সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে হবে, তেমনি পুরুষকেও তার দায়িত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নারী-পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ সমাজ।
আজকের নারী অনেক দূর এগিয়েছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে নারীর অগ্রগতি শুধু প্রশংসিত হবে না—তার মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাও নিশ্চিত হবে।
সুস্থ সমাজ গঠনের দায়িত্ব নারী কিংবা পুরুষ—কোনো একক পক্ষের নয়। বিবেকবান, মানবিক ও দায়িত্বশীল নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে সমাজকে অবক্ষয়ের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে।
সুলেখা পাল
সাধারণ সম্পাদক,
মহিলা পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র



















