Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   সুরের মানুষ রামকানাই দাশ: স্মৃতিতে আজও বাবার মুখ

সুরের মানুষ রামকানাই দাশ: স্মৃতিতে আজও বাবার মুখ

সুরের মানুষ রামকানাই দাশ: স্মৃতিতে আজও বাবার মুখ

কাবেরী দাশ:

আজ আমার বাবা, একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সংগীতসাধক পণ্ডিত রামকানাই দাশের ১২তম প্রয়াণ দিবস। দেখতে দেখতে তাঁর চলে যাওয়ার বারো বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে জীবনের অনেক কিছু বদলে গেছে, কিন্তু বাবাকে ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলো আজও আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর মূল্য তত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।

ছোটবেলা থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবার সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তাঁর কাছে সংগীতের তালিম নেওয়া ছিল আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাবা ছিলেন আমার প্রথম সংগীতগুরু। তাঁর কাছে সংগীত শেখা শুধু সুর, তাল ও লয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা, সাধনা, শৃঙ্খলা এবং একজন শিল্পীর দায়িত্ববোধও তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি।

একজন শিল্পীর জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল বলেই তাঁর সংগীতসাধনার অন্তর্নিহিত শ্রম, ধৈর্য ও নিষ্ঠাকে অন্যভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। তাঁর প্রতিভা ও দীর্ঘ সাধনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল একুশে পদক। এই সম্মান তাঁর শিল্পীসত্তার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু পরিবারের মানুষ হিসেবে আমি তাঁকে দেখেছি আরও সহজ, আরও ঘরোয়া এবং আরও মানবিক এক পরিসরে।

বাবা ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, উদার ও বন্ধুবৎসল মানুষ। বড় শিল্পী হওয়ার কোনো অহংকার তাঁর আচরণে ছিল না। মানুষের সঙ্গে সহজেই মিশতেন, বন্ধুত্বকে মূল্য দিতেন এবং পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের এই মানবিক দিকটি তাঁর শিল্পী পরিচয়ের মতোই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

বাবার সঙ্গে কাটানো পারিবারিক স্মৃতির মধ্যে খাবার ও রান্নার প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে মনে পড়ে। তিনি ছিলেন ভোজনরসিক এবং নিজের হাতে রান্না করতে ভালোবাসতেন। চমৎকার রান্না করতেন এবং অন্যকে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। কারও পছন্দের খাবার রান্না করে নিজের হাতে তাকে খাওয়ানোর মধ্যে তিনি বিশেষ আনন্দ খুঁজে পেতেন। এখন তাঁর রান্নার কথা মনে হলে খাবারের স্বাদের পাশাপাশি তাঁর সেই গভীর আন্তরিকতাটিও মনে পড়ে।

সংগীতের বাইরে প্রকৃতিও ছিল তাঁর আরেক গভীর ভালোবাসার জায়গা। সবজি বাগান করতে তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন। নিউইয়র্কে আমাদের বাগান তাঁর যত্নে ফুলে-ফলে ভরে উঠত। গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা এবং ফলন দেখার মধ্যে তিনি যে আনন্দ পেতেন, তা ছিল সত্যিই অসাধারণ।

তাঁকে বাগানে ব্যস্ত থাকতে দেখার স্মৃতি আজও আমার কাছে বিশেষ প্রিয়। কখনো কখনো মনে হয়, সংগীতসাধনা আর বাগান করার মধ্যে বাবার কাছে এক ধরনের মিল ছিল। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ধৈর্য, যত্ন ও নিষ্ঠা দিয়ে কিছু গড়ে তুলতেন। একটি গাছ যেমন সময় নিয়ে বেড়ে ওঠে, তেমনি একজন শিল্পীর সাধনাও ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায়। হয়তো এ কারণেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর এত গভীর টান ছিল।

বাবার সংগীত-উত্তরাধিকারের সঙ্গে আজ আমার কন্যারাও যুক্ত। তারা তাঁর কাছেই শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেছে। দাদুর কাছে তাদের গান শেখার দৃশ্যগুলো এখন আমার কাছে অমূল্য স্মৃতি। একজন শিল্পীর সাধনা যখন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও প্রবাহিত হয়, তখন তা আর শুধু স্মৃতি থাকে না—তা হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার। আমার কন্যাদের সংগীতচর্চার মধ্যে বাবার সেই উত্তরাধিকারের একটি অংশ দেখতে পাই।

মায়ের প্রতিও বাবার ভালোবাসা ছিল গভীর। তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে ছিল পারস্পরিক মমতা, বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধা। বাবা সবসময় মাকে উৎসাহ দিতেন নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে, নতুন কিছু শিখতে এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাখতে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু প্রিয় মানুষটির যত্ন নেননি, তাঁর বিকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার কথাও ভেবেছেন।

বাবার চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি তাঁর উপস্থিতির মূল্য। জীবনের নানা ছোট ছোট ঘটনায় তাঁকে মনে পড়ে। কোনো গান শুনলে মনে হয়, এ নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগত। কোনো গাছে নতুন ফুল বা ফল দেখলে মনে পড়ে তাঁর বাগানের কথা। রান্নার কোনো পরিচিত গন্ধ কখনো যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাঁর রান্নাঘরে। পরিবারের কোনো আনন্দের মুহূর্তে মনে হয়, বাবা থাকলে নিশ্চয়ই নিজের মতো করে আনন্দ করতেন।

এই স্মৃতিগুলো হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু প্রিয় একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোর মূল্যই সবচেয়ে বেশি হয়ে ওঠে।

বাবার জীবনকে শুধু একজন খ্যাতিমান শিল্পীর জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অদৃশ্য থেকে যায়। তিনি ছিলেন একজন সাধক, শিক্ষক, বাবা, স্বামী, বন্ধু এবং প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। তাঁর শিল্পীসত্তা যেমন অসংখ্য মানুষকে স্পর্শ করেছে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিমানুষের উষ্ণতা তাঁকে ঘনিষ্ঠজনদের কাছে করে তুলেছিল আরও আপন।

আমি সৌভাগ্যবান যে বাবার জীবনকে শুধু দূর থেকে দেখিনি। তাঁর পাশে থেকেছি, তাঁর কাছ থেকে সংগীত শিখেছি, তাঁর আনন্দ-বেদনার অনেকটা পথের সঙ্গী হয়েছি। তাঁর শিষ্য হিসেবে পেয়েছি সংগীতের শিক্ষা, আর সন্তান হিসেবে পেয়েছি জীবনের শিক্ষা।

আজ ১২ বছর পর বাবাকে স্মরণ করতে গিয়ে তাই শুধু তাঁর চলে যাওয়ার বেদনা মনে আসে না; তাঁর সঙ্গে পাওয়া সময়ের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতাও অনুভব করি। তাঁর রেখে যাওয়া সংগীত, শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং অসংখ্য স্মৃতিই এখন আমাদের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।

একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন। একজন গুরু তাঁর শিষ্যদের মধ্যে বেঁচে থাকেন। আর একজন বাবা বেঁচে থাকেন তাঁর সন্তানদের স্মৃতি, জীবনবোধ ও নানা অভ্যাসের মধ্যে। পণ্ডিত রামকানাই দাশ আমার কাছে এই তিন পরিচয়েরই এক অনন্য সমন্বয়।

বাবা আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর সুর এখনও আছে। তাঁর শিক্ষা আছে। তাঁর শিষ্যরা আছেন। তাঁর নাতনিদের সংগীতচর্চা আছে। তাঁর হাতে যত্ন পাওয়া বাগানের স্মৃতি আছে। তাঁর রান্নার স্বাদ মনে আছে। মায়ের প্রতি তাঁর মমতার গল্প আছে। আর আছে আমার জীবনের অসংখ্য দিনের সঙ্গে মিশে থাকা তাঁর উপস্থিতি।

তাই বাবাকে মনে পড়লে শুধু হারানোর কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে—একজন মানুষ তাঁর জীবন দিয়ে কত কিছু রেখে যেতে পারেন।

বাবা, তোমার ১২তম প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় তোমাকে স্মরণ করছি। তোমার কাছ থেকে পাওয়া সংগীত, শিক্ষা ও জীবনবোধকে ধারণ করে এগিয়ে চলাই তোমার প্রতি আমার সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তুমি নেই, কিন্তু তোমার সুর আছে। তোমার শিক্ষা আছে। তোমার স্মৃতি আছে। আর আমাদের জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে তুমি আজও বহমান।

কাবেরী দাশ
প্রেসিডেন্ট, সংগীত পরিষদ নিউইয়র্ক