শাহরিয়ার কবির—ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তচিন্তার অগ্রপথিক
হুমায়ূন কবীর ঢালী:
শাহরিয়ার কবির বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মী। ১৯৫০ সালের ২০ নভেম্বর ফেনীতে জন্মগ্রহণ করা এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে লেখালেখি ও জনমত গড়ে তোলার জন্য পরিচিত।
তাঁর সাহিত্যকর্মে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, কিশোর অ্যাডভেঞ্চার এবং মৌলবাদবিরোধী নানা বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিশোর উপন্যাস ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়’, ‘পাথারিয়ার খনিরহস্য’, ‘একাত্তরের যীশু’, ‘আবুদের অ্যাডভেঞ্চার’, ‘হানাবাড়ির রহস্য’, ‘নিকোলাস রোজারিওর ছেলেরা’, ‘কার্পেথিয়ানের কালো গোলাপ’ এবং ‘বহুরূপী’।
মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়েও তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ ধারার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বৃত্তবন্দি ইতিহাসে মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধ’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতের অপরাজনীতি’, ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন ও বাংলাদেশের রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের মৌলবাদ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ এবং ‘জাহানারা ইমামের শেষ দিনগুলি’।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, সংখ্যালঘু অধিকার ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন লেখালেখি করেছেন। একই সঙ্গে নির্মাণ করেছেন একাধিক প্রামাণ্যচিত্র। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শাহরিয়ার কবির গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে তিনি কারাবন্দি রয়েছেন। তাঁর বয়স, শারীরিক অসুস্থতা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাঁর সহকর্মী, লেখক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন তাঁর কারাবাস নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তিনি শাহরিয়ার কবিরের সাহিত্যিক অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, একজন প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ লেখকের ক্ষেত্রে কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা, সম্মান ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রিটন তাঁর মুক্তি এবং ন্যূনতম প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করারও জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
শাহরিয়ার কবিরের মতো প্রবীণ লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার, আটক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে উদ্বেগের বিষয়টি নতুন নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে প্রত্যেক ব্যক্তির ন্যায়বিচার, আইনি সহায়তা, যথাযথ চিকিৎসা এবং মানবিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত।
শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে সেই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া অবশ্যই চলতে পারে। তবে বিচার চলার পাশাপাশি একজন ৭৬ বছর বয়সী, অসুস্থ ও প্রবীণ লেখক-সাংবাদিকের জামিনের বিষয়টি মানবিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যেতে পারে। মামলা থাকা মানেই যে একজন প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখতেই হবে—এমন কোনো সার্বজনীন নীতি নেই।
শাহরিয়ার কবির কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন পরিচয়ের চেয়ে তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা, সাহিত্যকর্ম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মৌলবাদবিরোধী ভূমিকার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর বর্তমান অবস্থাকে শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা প্রয়োজন।
বর্তমান সরকার যদি মনে করে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচার চলবে, তবে বিচারিক প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলুক। কিন্তু একজন প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে জামিনের সুযোগ, যথাযথ চিকিৎসা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার প্রশ্নে শাহরিয়ার কবির দীর্ঘদিন ধরে যে অবস্থান নিয়েছেন, তার মূল্যায়ন ইতিহাসই করবে। কিন্তু একজন প্রবীণ লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর মৌলিক অধিকার, চিকিৎসা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা আজই নিশ্চিত করা জরুরি।
আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মানবিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করবে এবং শাহরিয়ার কবিরের জামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।



















