কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে শহীদ কাদরী স্মরণে ‘লেখকের অঙ্গন’-এর ২৮তম আসর: কবির কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, নির্বাসন ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে নিউইয়র্কে প্রাণবন্ত আলোচনা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, হাকিকুল ইসলাম খোকন :
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীর জীবন, সাহিত্য ও সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার নিয়ে নিউইয়র্কের কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘লেখকের অঙ্গন’-এর ২৮তম গ্রন্থালোচনা সভা। প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার ধারাবাহিক প্রয়াসের অংশ হিসেবে গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ শনিবার সাহিত্যপ্রেমী, কবি, লেখক ও পাঠকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের আসরটি উৎসর্গ করা হয় কবি শহীদ কাদরীর স্মৃতির প্রতি। আগস্ট মাসেই ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী এই কবি ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণের মাসে আয়োজিত আলোচনা সভায় কবির বহুমাত্রিক সাহিত্যিক সত্তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
আলোচনায় শহীদ কাদরীর কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, জীবনবোধ, ব্যক্তিত্ব, নির্বাসন, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, সাহিত্যভাবনা ও দুর্লভ সাক্ষাৎকারসহ তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের নানা দিক উঠে আসে। আলোচকদের বিশ্লেষণ ও স্মৃতিচারণে শুধু বহুল পরিচিত কবি শহীদ কাদরী নয়, তাঁর ব্যক্তিজীবনের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত এবং অন্তরঙ্গ নানা অধ্যায়ও নতুনভাবে সামনে আসে।
আরিফ মাহমুদ শৈবাল শহীদ কাদরীর জীবনের কম আলোচিত ও অন্তরঙ্গ বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি কবির ব্যক্তিত্ব, জীবনবোধ ও সাহিত্যচিন্তার নানা অনুষঙ্গ বিশ্লেষণ করে বলেন, শুধু বিখ্যাত কবিতার মধ্য দিয়ে শহীদ কাদরীকে দেখলে তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায় না। কবির নিঃসঙ্গতা, আত্মজিজ্ঞাসা ও অন্তর্গত অনুভূতিও তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তাকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাউসারী মালেক রোজী শহীদ কাদরীর মননশীলতা, স্মৃতি, মানবিকতা ও রসবোধের নানা দিক তুলে ধরেন। ব্যক্তিগত স্মৃতি ও কবির চিন্তাভাবনার বিভিন্ন প্রসঙ্গের পাশাপাশি তিনি শহীদ কাদরীর দুটি গদ্য নিয়েও আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে কবির জীবন ও সাহিত্যিক মানসের ঘনিষ্ঠ কিছু দিক শ্রোতাদের সামনে উন্মোচিত হয়।
মহিবুর রহমান শহীদ কাদরীর অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কবিতার পাশাপাশি বিদেশি কবিতা, গদ্য ও নাটক বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা ভাষার পাঠকদের যে সংযোগ তিনি তৈরি করেছিলেন, তা আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। শহীদ কাদরীর অনূদিত ‘অমৃতের সন্তান’ নাটকসহ তাঁর অনুবাদচর্চার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়।
সুরীত বড়ুয়া শহীদ কাদরীর কবিতায় শব্দচয়ন ও শব্দের নান্দনিক বিন্যাসের ওপর আলোকপাত করেন। অত্যন্ত সচেতনভাবে শব্দ নির্বাচন, শব্দের অবস্থান এবং সংযত অথচ আধুনিক ভাষাশৈলীর মাধ্যমে কবি কীভাবে কবিতার আবহ, সৌন্দর্য ও অন্তর্নিহিত অর্থ নির্মাণ করেছেন, তিনি তা বিশ্লেষণ করেন।
আহমাদ মাযহার শহীদ কাদরীর গদ্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন। কবি হিসেবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতির আড়ালে থাকা গদ্যকার শহীদ কাদরীর চিন্তার গভীরতা, ভাষার স্বাতন্ত্র্য, বিষয়বৈচিত্র্য ও জীবনদৃষ্টির বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেন।
এ বি এম সালেহউদ্দীন শহীদ কাদরীর দুর্লভ সাক্ষাৎকার ও কথোপকথন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। এসব সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কবির ব্যক্তিজীবন, সাহিত্যভাবনা, অভিজ্ঞতা ও সমকাল সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও নিউইয়র্কের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে শহীদ কাদরীর সাহিত্যিক জীবন ও চিন্তাভাবনা নিয়ে নেওয়া ১৫টি সাক্ষাৎকার নিয়ে ২০১৪ সালে ঢাকার কবি প্রকাশনী থেকে ‘সাক্ষাৎকার’ নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।
এ বি এম সালেহউদ্দীন বলেন, শহীদ কাদরীর এসব দুর্লভ সাক্ষাৎকার শুধু কবির ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যভাবনা বোঝার মূল্যবান দলিল নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে থাকবে।
মনিজা রহমান শহীদ কাদরীর জীবনে নির্বাসনের প্রভাব ও এর বহুমাত্রিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। দেশ ও স্বদেশ থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতা কবির মনোজগৎ ও সৃষ্টিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, তা তিনি বিশ্লেষণ করেন। নির্বাসনের নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, বিচ্ছিন্নতা এবং স্বদেশের প্রতি আকর্ষণের প্রতিফলন কবির সাহিত্যকর্মে কীভাবে ঘটেছে, তাঁর আলোচনায় তা উঠে আসে।
হাসান ফেরদৌস শহীদ কাদরীর পরিচিত ও অজানা—দুই সত্তাকেই আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কবির সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন ও চিন্তার অপেক্ষাকৃত অনালোচিত দিকগুলো তিনি সামনে আনেন। স্মৃতি, সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ মিলিয়ে তিনি শহীদ কাদরীর একটি বহুমাত্রিক প্রতিকৃতি তুলে ধরেন।
বদরুন নাহার শহীদ কাদরীর নিঃসঙ্গতা, নির্জনতা ও অন্তর্জগত নিয়ে আলোচনা করেন। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে কবির নিভৃত জীবন ও একাকিত্বের গভীর সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেন। আত্মমগ্নতা, সংবেদনশীলতা ও জীবনবোধের মধ্য দিয়ে কীভাবে কবির সৃষ্টিশীলতা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে, তা তিনি ব্যাখ্যা করেন।
আলোচনায় শহীদ কাদরীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও সাহিত্যকর্ম—‘উত্তরাধিকার’ (১৯৬৭), ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ (১৯৭৪), ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ (১৯৭৮), ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ (২০০৯), ‘অমৃতের সন্তান’, ‘আবর্ত’, গদ্য ও সাক্ষাৎকার—বিশেষভাবে স্থান পায়।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শহীদ কাদরী ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
আলোচনার পাশাপাশি উপস্থিত কবি, সাহিত্যিক, পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে শহীদ কাদরীর সাহিত্য ও জীবন নিয়ে ভাবনার আদান-প্রদান হয়। রানু ফেরদৌস, অভিক সোবহান, রাজিয়া নাজমী, মমতাজ বেগম সুমি, মোশাররফ হোসেন, বেনজির শিকদার, নাসির শিকদারসহ নিউইয়র্কের কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের সার্বিক সঞ্চালনা ও পরিচালনায় ছিলেন নীরা কাদরী। তিনি উপস্থিত সবাইকে এবং কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরির ম্যানেজার শান্তে গেন্সসহ আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
শহীদ কাদরীর জন্ম ও প্রয়াণের মাসে আয়োজিত ‘লেখকের অঙ্গন’-এর এ পর্বটি প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন হিসেবে উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে গভীর আগ্রহ ও অনুরণন সৃষ্টি করে। কবির সাহিত্যকর্মকে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর জীবন, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার অনালোচিত অধ্যায় নিয়ে এমন আয়োজন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রবাসী চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা।



















