Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   পূর্ণিমার রূপালি আলোয় রকওয়ে বিচে ফিরছে জোছনা উৎসব: সমুদ্রের ঢেউয়ে নাচ, গানে-কবিতায় প্রবাসী বাঙালির মিলনমেলা

পূর্ণিমার রূপালি আলোয় রকওয়ে বিচে ফিরছে জোছনা উৎসব: সমুদ্রের ঢেউয়ে নাচ, গানে-কবিতায় প্রবাসী বাঙালির মিলনমেলা

পূর্ণিমার রূপালি আলোয় রকওয়ে বিচে ফিরছে জোছনা উৎসব: সমুদ্রের ঢেউয়ে নাচ, গানে-কবিতায় প্রবাসী বাঙালির মিলনমেলা

গোপাল সান‍্যাল:
আটলান্টিকের নীল জলরাশি, সমুদ্রের গর্জন, পূর্ণিমার রূপালি আলো আর বাংলার গান-কবিতার মায়াবী সুর—সবকিছু মিলিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেতে যাচ্ছে নিউইয়র্কের কুইন্সের রকওয়ে বিচ। দীর্ঘ কয়েক বছরের বিরতির পর আগামী ৩১ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘জোছনা উৎসব’। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ের বন্ধনকে একসূত্রে গেঁথে আয়োজিত এই ভিন্নধারার উৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যে নিউইয়র্কসহ আশপাশের এলাকায় বসবাসরত বাঙালি সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।

নগরজীবনের ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ আর প্রবাসের যান্ত্রিকতার বাইরে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এই আয়োজন যেন এক টুকরো বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ। সমুদ্রের বুকে পূর্ণিমার আলো, বাতাসে নোনা গন্ধ, আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ি এবং মঞ্চে বাংলা গান, কবিতা, নৃত্য ও বাউল সুর—সব মিলিয়ে রকওয়ে বিচ সেদিন হয়ে উঠবে প্রবাসী বাঙালির আনন্দ, স্মৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।

উৎসবের আহ্বায়ক সাংবাদিক পিনাকী তালুকদার জানান, বিকেল ৫টায় শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। শিশুদের হাতে রঙিন ঘুড়ি, চোখে আনন্দ আর আকাশজুড়ে উড়তে থাকা স্বপ্ন—এই দৃশ্য দিয়েই শুরু হবে জোছনা উৎসবের বর্ণিল যাত্রা। আয়োজকদের মতে, ঘুড়ি ওড়ানো নিছক বিনোদন নয়; এটি স্বপ্ন, স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার প্রতীক।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে যখন রকওয়ের আকাশে উঠবে পূর্ণিমার চাঁদ, তখন সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যাবে বাংলার গান ও কবিতার সুর। সেই আবহকে ধারণ করে উৎসবের অনুভূতিকে যেন আগেই ছুঁয়ে যায় কয়েকটি পঙ্‌ক্তি

জোছনা নামুক সাগরজলে,
ঢেউ উঠুক গানের তালে,
কবিতারা ছুঁক নীল আকাশ,
ঘুড়ি উড়ুক স্বপ্নের পাশে।
প্রবাসজীবন হোক আলোময়,
জোছনার রাতে মিলুক হৃদয়।

পূর্ণিমার মনোমুগ্ধকর পরিবেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন স্বনামধন্য শিল্পী দিনাত জাহান মুন্নী, শাহ মাহবুব, রেশমী মির্জা, বিন্দু কণা, বাউল মেলাল করীম, করিম হাওলাদারসহ আরও অনেকে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে থাকবেন আলভান চৌধুরী, সাগ্নিক মজুমদার ও জেরিন মাইশা। নৃত্য পরিবেশন করবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা), নৃত্যাঞ্জলি ও মৃথান ড্যান্স একাডেমি। পাশাপাশি থাকবে আবৃত্তি, গীতিকাব্য, বাউল গানের আসর এবং নানা সৃজনশীল পরিবেশনা।

উৎসবের প্রধান উপদেষ্টা নাট্যজন লুৎফুন নাহার লতা জানান, এবারের আয়োজনে জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মৌসুমীসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন। ফলে এবারের জোছনা উৎসব প্রবাসী বাঙালিদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।

উৎসব উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর এমন আয়োজনের প্রশংসা করে বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান মানুষের সৌন্দর্যবোধকে জাগ্রত করে এবং সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়।

প্রবীণ সাংবাদিক মুহাম্মদ ফজলুল রহমান তাঁর শুভেচ্ছা বার্তায় আবেগঘন ভাষায় বলেন, জোছনা উৎসবে উপস্থিত হয়ে জোছনাকে বলবেন—হে জোছনা, তোমার আলোয় আমাদের সকল অন্ধকার দূর করে দাও।

উৎসবের স্বপ্নদ্রষ্টা গোপাল সান্যাল বলেন, প্রকৃতি যেমন সবার, জোছনাও তেমনি সবার। তাই এই উৎসবও সবার জন্য উন্মুক্ত। তিনি দলমত-নির্বিশেষে প্রকৃতিপ্রেমী, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং প্রবাসী বাঙালিদের পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন নিউ জার্সি থেকে নির্বাচিত কাউন্সিলম্যান, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবী।

ভিন্নধর্মী এই আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক নুরুল আমিন বাবু। পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছেন ফোবানা চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী ও নিউটন দাস। আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বীকৃতি বড়ুয়া, সাংবাদিক আব্দুল হামিদ ও গোপাল সান্যাল। ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করছেন ব্যারিস্টার ড. এনামুল হক ও অ্যাকটিভিস্ট রামদাস ঘরামী।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করবেন তাহরিনা পারভীন প্রীতি ও স্বাধীন মজুমদার। গণযোগাযোগ ও মিডিয়া সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সাংবাদিক আসলাম আহমাদ খান।

শিশুদের জন্যও থাকছে বিশেষ আয়োজন। শিশু সংগঠন ‘আমরা শিশুদের সঙ্গী’ (আশিস) এবং রাইটার্স ক্লাব যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আয়োজিত হবে ঘুড়ি উৎসব। শিশুদের বিনামূল্যে ঘুড়ি ও নাটাই দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি শিশুর সঙ্গে অভিভাবকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উৎসবে প্রবেশ সবার জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

আয়োজকদের বিশ্বাস, এবারের জোছনা উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি, প্রকৃতিপ্রেম, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য উৎসব। পূর্ণিমার আলোয় সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে প্রবাসী বাঙালিরা ফিরে পাবেন শৈশবের স্মৃতি, গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, শরতের আকাশ আর বাংলার চিরচেনা জোছনা রাতের অনুভূতি।

জোছনা উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এখানে কোনো বিভাজন নেই। নেই দল-মত, শ্রেণি-পেশা কিংবা বয়সের সীমারেখা। প্রকৃতি যেমন সবার, জোছনাও তেমনি সবার। আর সেই জোছনার আলোয় মানুষে মানুষে মিলনের যে আয়োজন, সেটিই এই উৎসবকে অন্য সব আয়োজন থেকে আলাদা করে তুলেছে।

৩১ জুলাই শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাই রকওয়ে বিচে অপেক্ষা করছে এক ভিন্নধারার, ভিন্নমাত্রার সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। সমুদ্র বিলাসে, জলে, গানে, নৃত্যে, কবিতায় ও পূর্ণিমার আলোয় জোছনা উপভোগ করতে স্বপরিবারে সবাইকে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আয়োজকরা।

সেদিন হয়তো আটলান্টিকের ঢেউ এসে ছুঁয়ে যাবে বালুকাবেলা, আকাশে ভেসে উঠবে পূর্ণিমার চাঁদ, শিশুরা উড়াবে রঙিন ঘুড়ি, শিল্পীরা গাইবেন বাংলার গান, কবিরা উচ্চারণ করবেন ভালোবাসার কবিতা। আর হাজার মাইল দূরের প্রবাসে দাঁড়িয়ে বাঙালির হৃদয় আবারও বলে উঠবে—দেশ থেকে দূরে থাকলেও বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা ও বাঙালির আবেগ আমাদের হৃদয়েই বেঁচে আছে।

জোছনার আলোয় দূর হোক অন্ধকার,
সমুদ্রের ঢেউয়ে জাগুক প্রাণ;
গান-কবিতায় মিলুক হৃদয়,
সংস্কৃতিতে গড়ুক বন্ধন।
রকওয়ের আকাশে উড়ুক স্বপ্ন,
পূর্ণিমার রাতে জাগুক বাংলাদেশ।
গোপাল সান‍্যাল 
সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব‍্যক্তিত্ব ।