Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   মাহমুদ সেলিম: যে কণ্ঠ আজও জাগায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—৭৪তম জন্মদিনে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় অগ্রসৈনিককে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মাহমুদ সেলিম: যে কণ্ঠ আজও জাগায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—৭৪তম জন্মদিনে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় অগ্রসৈনিককে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মাহমুদ সেলিম: যে কণ্ঠ আজও জাগায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—৭৪তম জন্মদিনে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় অগ্রসৈনিককে শ্রদ্ধাঞ্জলি

উত্তম কুমার সাহা:
একটি জাতির ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরে রচিত হয় না; শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির অকুতোভয় যোদ্ধারাও সেই ইতিহাস নির্মাণে সমানভাবে ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এমনই এক প্রজ্জ্বলিত নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ সেলিম। তাঁর কণ্ঠে যেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রত্যয়, তেমনি তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রামে ছিল সামরিক স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও অপশক্তির বিরুদ্ধে এক নির্ভীক উচ্চারণ। ৭৪তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।
১৯৫৩ সালের ২০ জুলাই ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর ইউনিয়নের ছোটরাজপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া মাহমুদ সেলিম কৈশোর থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগে নিজেকে গড়ে তোলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি বেতিয়ারা যুদ্ধের একজন সাহসী সৈনিক হিসেবে অংশ নেন। স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা এই মানুষটি যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে আরেকটি দীর্ঘ লড়াই শুরু করেন—সংস্কৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লড়াই।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে তিনি কয়েক দশক ধরে দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। গণসংগীতকে তিনি কেবল সুরের অনুষঙ্গ হিসেবে দেখেননি; এটিকে তিনি মানুষের অধিকার, প্রতিবাদ, সাম্য ও মুক্তচিন্তার শক্তিশালী ভাষায় পরিণত করেছেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত গণসংগীত অসংখ্য তরুণকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করেছে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যখন স্বাধীনতার ইতিহাসকে আড়াল করার অপচেষ্টা চলছিল, তখন মাহমুদ সেলিম রচনা করেন কালজয়ী গীতিআলেখ্য ইতিহাস কথা কও। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রযোজনা ছিল না; এটি ছিল ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। দেশের শহর থেকে গ্রাম—বাংলার অসংখ্য প্রান্তে পরিবেশিত এই গীতিআলেখ্য নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। সংস্কৃতির শক্তি যে সমাজ ও রাষ্ট্রকে জাগিয়ে তুলতে পারে, মাহমুদ সেলিম তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
একজন গণসংগীত শিল্পী, সঙ্গীত শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর বহুমাত্রিক অবদান আজ জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতির মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, মানবিক সমাজ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তিনি আজীবন লালন করেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রও তাঁর অবদানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছে। সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, উদীচী সম্মাননা পদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
আজকের সময়ে, যখন সমাজে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং ইতিহাস বিকৃতির নানা প্রবণতা দৃশ্যমান, তখন মাহমুদ সেলিমের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তিনি মনে করিয়ে দেন—সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির বিবেক, প্রতিবাদের ভাষা এবং মুক্তচিন্তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
৭৪তম জন্মদিনে এই প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগ্রামীর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও অব্যাহত সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ কামনা করি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মাহমুদ সেলিমের নাম উচ্চারিত হবে সেইসব মানুষের কাতারে, যাঁরা শিল্পকে মানুষের মুক্তির হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে—স্বাধীনতার চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে হলে সংস্কৃতির মশাল কখনো নিভতে দেওয়া যায় না।
উত্তম কুমার সাহা , সম্পাদক ও প্রকাশক—প্রজ্ঞা নিউজ।