৩৫ বছরের গৌরবময় পথচলায় প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মহামিলন: নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাসে সফল সমাপ্তি নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়
- By Progga News Desk --
- 27 May, 2026
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
উৎসব, আবেগ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানার অনন্য এক মহামিলনে পর্দা নামলো ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার। চার দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের সফল সমাপ্তি হয়েছে গত ২৫ মে ২০২৬ সোমবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে উৎসবমুখর পরিবেশে। সকাল থেকেই ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক, গবেষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং নতুন প্রজন্মের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে পুরো বইমেলা প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয়েছিল এক টুকরো প্রাণের বাংলাদেশে।
২২ মে শুরু হওয়া চার দিনের এই আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রওনক জাহান, ফরিদুর রেজা সাগর, সুবোধ সরকার, দীপেন ভট্টাচার্য, তৌফিক ইমরোজ খালিদী, ফারুক মঈনউদ্দীন, সাদাত হোসাইন, বব হোলম্যানসহ দেশ-বিদেশের বহু লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
প্রথম দিনেই সমবেত সংগীত, নৃত্যানুষ্ঠান, কবিতা পাঠ, আজীবন সম্মাননা প্রদান এবং মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বিশ্বজিৎ সাহাকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বইমেলার সাংস্কৃতিক আবহ পৌঁছে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও শেকড়ের বন্ধন যেন নতুন করে ধরা দেয় পুরো আয়োজনে।
প্রথম দিনের পর টানা দুই দিন নিউইয়র্কে বৃষ্টি হলেও বইমেলার প্রাণচাঞ্চল্যে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে—প্রবাসে বাংলা ভাষা, বই ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের টান কত গভীর এবং হৃদয়স্পর্শী। প্রতিদিনই ছিল সাহিত্য আড্ডা, সেমিনার, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নাট্য মঞ্চায়ন, সংগীতানুষ্ঠান এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা।
দ্বিতীয় দিনে “গদ্যের অন্দরমহল” শীর্ষক লেখক-পাঠক আড্ডায় অংশ নেন ইমদাদুল হক মিলন, দীপেন ভট্টাচার্য, সাদাত হোসাইন, ফেরদৌস সাজেদীন, মোস্তফা সারওয়ার, বিরূপাক্ষ পাল ও আশরাফ কায়সারসহ অনেকে। একই দিনে শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, নতুন বইয়ের উন্মোচন এবং কবিতা পাঠ দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সন্ধ্যায় “কলম ও কৌতূহল” শীর্ষক সাহিত্য আলোচনা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “রক্তকরবী” নাটকের মঞ্চায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে। রাতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অদিতি মহসিনের একক সংগীতানুষ্ঠান।
৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬ আয়োজক ও মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সিইও বিশ্বজিৎ সাহা
তৃতীয় দিনে বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশু-কিশোর-যুবাদের চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা। বাংলা ভাষা, একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিপুল সংখ্যক শিশু অংশ নেয়। একইসঙ্গে ছিল কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নতুন বই নিয়ে আলোচনা এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্য বিষয়ক বিশেষ সেমিনার। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বইমেলাকে দিয়েছে এক ভিন্ন প্রাণচাঞ্চল্য ও ভবিষ্যতের আশাবাদ।
তৃতীয় দিনের সন্ধ্যায় ঘোষণা করা হয় মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬।
এবারের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেন ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও ঔপন্যাসিক ড. আব্দুন নূর। পুরস্কারের প্রবর্তক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে শামসুজ্জামান খান থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে এ সম্মাননা পেয়েছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, দিলারা হাশেম, সেলিনা হোসেন, সমরেশ মজুমদার, গোলাম মুরশিদ, আসাদ চৌধুরী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার এবং এবছর ড. আব্দুন নূর।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে ড. আব্দুন নূরকে নগদ ৩ হাজার মার্কিন ডলার, সম্মাননা ক্রেস্ট এবং বিশেষ স্মারক তুলে দেওয়া হয়। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশে থাকতেই সাহিত্যচর্চা শুরু করি। অনেক সময় নিজের মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হয়। আজকের এই সম্মান আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।”
শেষ দিনে “চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার” অর্জন করে বাতিঘর। একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় ইমদাদুল হক মিলনের স্মারক বক্তৃতা, জীবনানন্দ দাশ বিষয়ক আলোচনা এবং নজরুলের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
সমাপনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের মুখোমুখি অনুষ্ঠান। “কলম ও কৌতূহল” শীর্ষক এই আড্ডায় দর্শকদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। সাহিত্য, নতুন প্রজন্মের পাঠাভ্যাস, সামাজিক পরিবর্তন এবং সৃজনশীলতা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা চলে। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিশ্বজিৎ সাহা।
শেষ দিনটি কার্যত শিশু-কিশোর ও যুবাদের উৎসবে পরিণত হয়। দিনব্যাপী ছিল রং-তুলিতে শিশু-কিশোর-যুব উৎসব, গল্পলেখার কর্মশালা, সংগীত, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি এবং তরুণদের লেখালেখি বিষয়ক আলোচনা। বইমেলার পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা।
বিশেষভাবে আলোচনায় আসে “সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)” শীর্ষক আলোচনা সভা। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকান তরুণদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন বইমেলায় নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রযুক্তি, সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, গণমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্রে AI-এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং মানবিক সৃজনশীলতার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।
আয়োজকদের মতে, মার্কিন সমাজব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি সন্তানদের এমন অংশগ্রহণ দুই প্রজন্মের মধ্যে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করবে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক চিন্তার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আলোচনা সভায় অংশ নেন দানিয়াল দর্পণ সামিও, প্রজ্ঞাত্তম সাহা প্রজ্ঞা, মীম দে শ্রাবনী, ফারজিন কবীর কাব্য, অদ্রিতা দে ও ধীরাজ সাহা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাব্বানী ভূঁইয়া। এ আয়োজন সফল করতে নিরুপমা সাহা ও সীমা সুস্মিতার আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন আয়োজকরা।
অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয় ProggaNews.us ফেসবুক পেজে। টিনএজার ও তরুণ সেখানে অংশ নিয়ে সাহিত্য, প্রযুক্তি, ভবিষ্যতের শিক্ষা এবং মানবসৃজনশীলতার ওপর AI-এর প্রভাব নিয়ে মতবিনিময় করে। বক্তারা বলেন, প্রযুক্তি যত এগোবে, মানবিক বোধ ও সাংস্কৃতিক শিকড় ধরে রাখাই হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এছাড়াও বেহালার সুরে সুরে Proggattom Progga-এর মনোমুগ্ধকর ভায়োলিন পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে বইমেলা প্রাঙ্গণ। শিশুদের মধ্যে কবিতা আবৃত্তি করেন পূর্ণাত্তম সাহা পূর্ণা, ভাষা সাহা, পূর্ণা দে, চারুলতা, লিয়ানা মানহা ও ফারজিন কবির কাব্য।
এছাড়াও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের পরিবেশনায় গান, নৃত্য ও আবৃত্তিও দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়।
শেষ দিনের আবহাওয়াও ছিল বইমেলার অনুকূলে। টানা দুই দিনের বৃষ্টির পর উজ্জ্বল রোদে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রকাশকদের মতে, শেষ দিনের বিক্রি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। বিশেষ করে নতুন বই, গবেষণাগ্রন্থ, শিশুতোষ বই এবং প্রবাসজীবনভিত্তিক প্রকাশনাগুলোর প্রতি পাঠকদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সমাপনী অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয়, ৩৬তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ২১ থেকে ২৪ মে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ পর্দার আড়ালে নিরলস কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। ফাউন্ডেশনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বলেন, “প্রবাসের বাংলা সংবাদমাধ্যমও বইমেলার সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।”
৩৫তম বইমেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম বইমেলাকে সফল করে তুলতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অন্যদিকে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “দেখতে দেখতে ৩৫ বছর পার হয়ে গেল। নিউইয়র্ক বইমেলা আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাঙালির এক যৌবনের অহংকার।”
চার দিনের এই মহোৎসব আবারও প্রমাণ করেছে—বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির আত্মিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা আজ শুধু একটি সাহিত্য উৎসব নয়, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা, চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।



















