মধুর আমার মায়ের হাসি— কাবেরী দাশ
- By Progga News Desk --
- 11 May, 2026
“মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রিভূবনে নাই।”
কবি কাজী কাদের নেওয়াজের এই অমর পঙ্ক্তিগুলো যেন যুগে যুগে প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিরই প্রতিধ্বনি। ‘মা’— মাত্র একটি ছোট্ট শব্দ, অথচ এর বিস্তার আকাশের চেয়েও বিশাল, সমুদ্রের চেয়েও গভীর। পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা, মমতা, ত্যাগ, আশ্রয় আর নির্ভরতার আরেক নামই যেন মা।
মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের চরণে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। আজকের এই লেখাটি আমার নিজের মাকে ঘিরে, আবার একজন মা হিসেবে আমার নিজস্ব অনুভূতিরও এক আন্তরিক প্রকাশ।
আমার জন্ম বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট নিভৃত পরিবেশে। সেই গ্রামজীবনের নির্মল আলো-বাতাসে কেটেছে জীবনের প্রথম সাতটি বছর। ধানের সবুজ ক্ষেত, কাশফুলে ভরা মাঠ, নদীর জলে সাঁতার, স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়ানো, আম-জাম-কুল কুড়িয়ে বেড়ানো— সব মিলিয়ে শৈশবটা ছিল এক টুকরো রূপকথা। মনে হতো, যেন বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গা-অপুর মতোই মুক্ত আর আনন্দময় এক জীবন।
সেই শৈশবের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আমার মা। গ্রামে বসবাস করলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন, দূরদর্শী এবং শিক্ষানুরাগী একজন নারী। আমাদের পড়াশোনা, সংগীতচর্চা এবং মানসিক বিকাশ নিয়ে তিনি সবসময় গভীরভাবে ভাবতেন। তাঁর নিজের জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু আমাদের স্বপ্নগুলোকে তিনি অসাধারণ মমতায় লালন করেছেন।
আমার মা ছিলেন এক কোমল হৃদয়ের মানুষ। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর সহমর্মিতা ছিল অসীম। ছোটবেলায় আমাদের তিন ভাইবোনকে তিনি প্রয়োজন হলে শাসন করেছেন, কিন্তু কখনো অপমান করেননি, কখনো কঠোর বাক্যে আঘাত দেননি। তাঁর ভালোবাসার মধ্যে ছিল এক ধরনের নীরব শিক্ষা, যা আজও আমাদের জীবনের পথ দেখায়।
আজ এই মধ্যবয়সে এসে অনুভব করি— মা শুধু আমার মা নন, তিনি যেন আমার সন্তানের মতোও হয়ে উঠেছেন। বয়সের ভারে তিনি এখন অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই আমার প্রতিদিনের প্রধান দায়িত্ব এখন তাঁকে ঘিরেই। আমার সমস্ত চিন্তা, ব্যস্ততা আর ভালোবাসার কেন্দ্র আজ দুটি “মা”— আমার জন্মদাত্রী মা এবং আমার সংগীত। আমি নিজেকে সত্যিই সৌভাগ্যবান মনে করি যে, এখনো মায়ের সেবা করার সুযোগ পাচ্ছি।
বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে বারবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর গানটির কথা মনে পড়ে—
“খড়ের প্রতিমা পূজিস রে তোরা,
মাকে তো তোরা পূজিসনে,
প্রতি মায়ের মাঝে প্রতিমা বিরাজে,
হায়রে অন্ধ, খুঁজিসনে।”
কত গভীর সত্য লুকিয়ে আছে এই কথাগুলোর মধ্যে! রক্ত-মাংসের জন্মদাত্রী মাকে অবহেলা করে কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে ভক্তি প্রকাশের কোনো অর্থ নেই। সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক তার মা। একজন মা-ই সন্তানের হৃদয়ে মানবতা, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা আর মূল্যবোধের বীজ বপন করেন।
আজ একজন মা হিসেবে নিজের কথাও বলতে ইচ্ছে করছে। আমার দুই কন্যা— পারমিতা ও শ্রুতিকণা— আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। আমি যখন নিউইয়র্কে আসি, তখন বড় মেয়ে পারমিতার বয়স মাত্র সাত বছর। এরপর জন্ম নেয় ছোট মেয়ে শ্রুতিকণা। নতুন দেশ, নতুন জীবন, অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, সংসার ও পেশাগত ব্যস্ততা— সব মিলিয়ে সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
অনেক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হয়তো কন্যাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। কখনো কখনো ছোট ভুলের জন্যও বেশি শাসন করেছি। তবে একটি জায়গায় কখনো কার্পণ্য করিনি— তাদের শিক্ষা ও সংগীতচর্চা। কারণ আমি বিশ্বাস করি, সন্তানের হাতে সবচেয়ে বড় উপহার হলো সুশিক্ষা ও সংস্কৃতি।
আজ যখন মানুষের মুখে আমার কন্যাদের প্রশংসা শুনি, যখন কেউ আমাকে একজন সফল মা বলে অভিহিত করেন, তখন জীবনের সব কষ্ট যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। মনে হয়, একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সন্তানের সুন্দর মানুষ হয়ে ওঠা।
মা দিবসে আমার কন্যারা আমাকে নানা উপহার দেয়, কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায়, আমাকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যি বলতে কি— সবচেয়ে বড় উপহার হলো তাদের ভালোবাসা, তাদের শ্রদ্ধা আর মমতা।
আসলে সন্তানরা পরিবার থেকেই শেখে। তারা যা দেখে, তাই অনুকরণ করে। আমি যদি আমার মাকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, তবে আমার সন্তানরাও একদিন আমাকেও তেমনই ভালোবাসবে। ভালোবাসা এবং সম্মান কখনো মুখে শেখানো যায় না, তা আচরণের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।
তাই মা দিবসে আমাদের সবার একটাই প্রতিজ্ঞা হোক—
মাকে সম্মান করব, মাকে ভালোবাসব, তাঁর মুখের হাসি অমলিন রাখব। কারণ মা শান্তিতে থাকলেই পরিবারে শান্তি আসে, আর পরিবার শান্তিতে থাকলেই পৃথিবী সুন্দর হয়ে ওঠে।
মায়ের হাসির চেয়ে পবিত্র, নির্মল ও স্বর্গীয় আর কিছুই নেই। সেই হাসিই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
— কাবেরী দাশ
সংগীত শিক্ষক ও প্রেসিডেন্ট, সংগীত পরিষদ নিউইয়র্ক



















