Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবাধে পলিথিনের ব্যবহার: পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ক্যান্সার ও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতির আশঙ্কা, সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবাধে পলিথিনের ব্যবহার: পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ক্যান্সার ও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতির আশঙ্কা, সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবাধে পলিথিনের ব্যবহার: পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ক্যান্সার ও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতির আশঙ্কা, সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশগত ঝুঁকি ও জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ—কোনো কিছুই যেন থামাতে পারছে না পলিথিনের অবাধ ব্যবহার। নিউইয়র্ক নগরীর বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিনই চলছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মুদি দোকান, কাপড়ের দোকান, তৈজসপত্রের ব্যবসা কিংবা সুপারশপ—প্রায় সর্বত্রই পণ্য কেনাকাটার সঙ্গে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ। অথচ পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নিউইয়র্কে রয়েছে কঠোর আইন।

নগরীর জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কস ও ব্রুকলিনের বিভিন্ন বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পলিথিনের ব্যবহার যেন নিত্যদিনের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ক্রেতারা খালি হাতে দোকানে প্রবেশ করছেন, আর কেনাকাটা শেষে ফিরছেন একাধিক পলিথিন ব্যাগ হাতে নিয়ে। বিশেষ করে কাঁচাবাজারে আলু, পেঁপে, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, পটলসহ বিভিন্ন সবজি আলাদা আলাদা পলিথিনে ভরে দেওয়া হচ্ছে। মাছ, মাংস, ডিম ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

পলিথিনের ব্যবহার শুধু পরিবেশ দূষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। প্লাস্টিকের কিছু উপাদান ও রাসায়নিক খাদ্যদ্রব্যের সংস্পর্শে এসে খাদ্যে মিশতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম, প্রজননস্বাস্থ্য ও মানবদেহের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্কও রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নির্দিষ্ট প্লাস্টিক-সম্পর্কিত রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ রয়েছে।

এ ছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ালে বিষাক্ত ও ক্ষতিকর বায়ুদূষণকারী পদার্থ নির্গত হতে পারে। এসব পদার্থ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, ফুসফুসের ক্ষতি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে পলিথিনের নির্বিচার ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউইয়র্কের বিভিন্ন বাজারে পলিথিনের এমন ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ক্রেতা মনে করেন, আলাদা পলিথিনে সবজি রাখলে তা সংরক্ষণ করা সহজ হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতাদের চাহিদার কারণেই তাঁদের পলিথিন সরবরাহ করতে হচ্ছে।

জ্যাকসন হাইটসে খালি হাতে বাজার করতে আসা মোফাজ্জল হোসেন পাঁচ ধরনের সবজি কেনার পর প্রতিটি সবজির জন্য আলাদা পলিথিন ব্যাগ পান। এ বিষয়ে  তিনি বলেন, খালি হাতে বাজারে এসেছিলাম। পাঁচ রকমের সবজি কিনেছি। দোকানদার প্রতিটি সবজি আলাদা পলিথিনে দিয়েছেন। বাসায় রাখতে সুবিধা হয়, পলিথিনে থাকলে সবজিগুলো ভালো থাকে। আলাদা আলাদা পলিথিনে বাজার দিলে সুবিধা হয়।

আরেক ক্রেতা আকতার হোসেনের হাতে দেখা যায় এক হালি ডিম, সেটিও পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো। বাজারের বিভিন্ন দোকানে এমন দৃশ্য যেন নিত্যদিনের ঘটনা।

কাঁচামাল বিক্রেতা হায়দার পলিথিন ব্যবহারের বিষয়ে সন্ধান২৪.কমকে বলেন, সবাই তো পলিথিন দিচ্ছে। ক্রেতারা পলিথিন ছাড়া কাঁচামাল, মাছ কিংবা অন্যান্য পণ্য নিতে চান না। সবাই খালি হাতে বাজারে আসেন, কেনাকাটা শেষে পলিথিনে করে নিয়ে যান। যেদিন পলিথিন থাকে না, সেদিন অনেক ক্রেতা পণ্য নিতে চান না। তাঁরা নিজেদের ব্যাগ নিয়ে এলে আমরাও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে পারি। কারণ পলিথিন কিনতেও আমাদের টাকা খরচ হয়।

ব্যবসায়ীদের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে শুধু দোকানদারদের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ক্রেতাদের অভ্যাস পরিবর্তন, বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ এবং আইন বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ—সবকিছুই সমানভাবে জরুরি।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ব্যাগের অধিকাংশই একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। অপচনশীল এই বর্জ্য পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায়। ফলে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের পাশাপাশি নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। প্লাস্টিক বর্জ্য জলপথে প্রবেশ করলে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।

পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের মতে, বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালিত হলেও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন না এলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বাজারে যাওয়ার সময় নিজস্ব পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ বহন করা, অপ্রয়োজনীয় পলিথিন প্রত্যাখ্যান করা এবং ব্যবসায়ীদের পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

নিউইয়র্কে পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন ও বিধিনিষেধ থাকলেও বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এর ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আইন বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যবসায়ীদের সচেতন করার উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে ক্রেতা, বিক্রেতা ও প্রশাসন—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় নিষিদ্ধ পলিথিনের এই অবাধ ব্যবহার নগরীর পরিবেশকে আরও দূষিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।
সূত্র: সন্ধান২৪.কম