লালনের মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নিউইয়র্কে মুখরিত সাধুসঙ্গ: মাটির গান-এর আয়োজনে ফকির লালন সাঁইজির ১৩৬তম তিরোধান দিবস পালন, গান, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় মুগ্ধ প্রবাসীরা
উত্তম কুমার সাহা, প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
লালনের মানবতাবাদী দর্শন, সাম্য, প্রেম, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুখর হয়ে উঠল নিউইয়র্কের সাউথ ওজন পার্ক। বাঙালির মাটি, মানুষ, শেকড় ও লোকঐতিহ্যের চিরায়ত সংস্কৃতিকে প্রবাসের মাটিতে ধারণ করে ‘মাটির গান’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ফকির লালন সাঁইজির ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে বিশেষ সাধুসঙ্গ। লালনগীতি, বাউল দর্শন, আলোচনা, আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার রাত ৮টায় নিউইয়র্কের সাউথ ওজন পার্কে ‘মাটির গান’-এর সদস্য তুলি বিশ্বাসের নিজস্ব বাসভবনে (১১৪-৪১, ১৩৩ স্ট্রিট) এই সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল চ্যানেল আই (হৃদয়ে বাংলাদেশ) ও প্রজ্ঞা নিউজ ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নিউইয়র্কের নন্দিত উপস্থাপক উৎপল চৌধুরী। শুরুতে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান তবলা শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবু চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের (এবিপিসি) সভাপতি ও চ্যানেল আইয়ের সিইও রাশেদ আহমেদ, প্রজ্ঞা নিউজের সম্পাদক ও প্রকাশক উত্তম কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক ও আবৃত্তিশিল্পী মুনমুন সাহা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী জালালসহ বিশিষ্ট অতিথিরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ‘মাটির গান’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পরিচালক, বাংলাদেশ ও নিউইয়র্কের জনপ্রিয় বাউলশিল্পী মো. শাহীন হোসেন। পরে উপস্থিত অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়।
আলোচনা পর্বে লালন দর্শনের মানবিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠক ও আবৃত্তিশিল্পী গোপন সাহা, বিশিষ্ট উপস্থাপক স্বাধীন মজুমদার, সংগঠক ও বাচিক আবৃত্তিশিল্পী মিনহাজ আহমদ সাম্মু এবং কবি হাসান আল আব্দুল্লাহ। বক্তারা বলেন, ফকির লালন সাঁইয়ের দর্শন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি কিংবা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গান ও সাধনায় প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সব ধরনের বিভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান। বর্তমান বিশ্বে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্যের বিপরীতে লালনের মানবতাবাদী দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
সাধুসঙ্গের মূল আকর্ষণ ছিল লালনগীতি ও বাউলসংগীত। ‘মাটির গান’-এর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় লালন সাঁইজির মানবতাবাদী দর্শন, প্রেম, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার গান পরিবেশন করেন সংগঠনের সদস্য কণ্ঠশিল্পী খ্রিস্টেলা কুইয়া, তুলি বিশ্বাস, মলি ডেসা ও মহুয়া ভট্টাচার্য। তাঁদের পরিবেশনায় লালনের কালজয়ী গানগুলো উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে সৃষ্টি করে এক গভীর ভাবাবেগ ও মুগ্ধতার আবহ।
এছাড়াও সংগীত পরিবেশন করেন তাহমিনা আরা লাইজু, সুশীল সিনহা, মেরিয়ান রোজারিও, কবিতা সরকার, অতিথি শিল্পী তমা চক্রবর্তী এবং ‘মাটির গান’-এর সিইও ও সংগীতশিল্পী শাহীন হোসেন। শিল্পীদের পরিবেশনায় বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য ও বাউল সাধনার আবহ পুরো অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
সংগীত পরিবেশনায় তবলায় ছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান তবলা শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবু চৌধুরী, কিবোর্ডে রবিউল ইসলাম এবং পারকেশনে সুমন ও ফয়সাল। তাঁদের দক্ষ বাদন সংগীত পরিবেশনাকে দেয় বিশেষ মাত্রা।
ফকির লালন সাঁইয়ের সাধনার অন্যতম মূল শিক্ষা হলো মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ নয়, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন, বর্ণবৈষম্য ও সামাজিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবমুক্তি, ভালোবাসা ও মানবিক মর্যাদার যে দর্শন তিনি তুলে ধরেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সাধুসঙ্গের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই চিরন্তন মানবিক দর্শনকে প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলা লোকসংগীত, বাউল সংস্কৃতি ও শেকড়ের ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক নগরী নিউইয়র্কে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা।
তাঁদের মতে, প্রবাসে বসবাস করলেও নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলার লোকঐতিহ্য, বাউলগান, লালন দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত করানো সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ‘মাটির গান’-এর এই সাধুসঙ্গ সেই সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালনের একটি আন্তরিক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন অমিত বিশ্বাস ও জসিম উদ্দিন। তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অতিথিদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে ওঠে ঘরোয়া পরিবেশে এক ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক মিলনমেলা ।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে ছিল আন্তরিক আড্ডা ও সুস্বাদু খাবারের আপ্যায়ন। সংগীত, দর্শন, আবৃত্তি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই বিশেষ সাধুসঙ্গ।
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙালিদের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে ‘মাটির গান’-এর এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ এটি কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, বরং লালন সাঁইজির মানবমুক্তির দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাংলার হাজার বছরের লোকঐতিহ্যকে প্রবাসের মাটিতে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার এক অর্থবহ সাংস্কৃতিক প্রয়াস।
লালনের দর্শন যে দেশ, কাল, ধর্ম ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারে, নিউইয়র্কের এই সাধুসঙ্গ যেন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।



















